Monday, 28 November 2011

কল্যানী দত্তর পিঞ্জরে বসিয়া , কিছু আলোচনা / মধুছন্দা পাল । Inbox x Madhuchhanda Paul Sep 10 পিঞ্জরে বসিয়া প্রয়াত কল্যানী দত্তর মূলত সেকালের মেয়েদের নিয়ে লেখা বই । বইটির ... Madhuchhanda Paul Sep 10 Loading... Madhuchhanda Paul Sep 10 to গুরুচন্ডা৯ পিঞ্জরে বসিয়া প্রয়াত কল্যানী দত্তর মূলত সেকালের মেয়েদের নিয়ে লেখা বই । বইটির নাম প্রসঙ্গে লেখিকা লিখেছেন "পিঞ্জরে বসিয়া শুক কমলকুমার মজুমদারের একটি উপন্যাস ।কিন্তু এই শব্দগুলি কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় কবির পদ্য থেকে নেওয়া । কবিতাটির প্রথম স্তবকটি এইরকম - পিঞ্জরে বসিয়া শুক, মুদিয়া নয়ন / কি ভাবিছ মনে মনে ? অথবা তোমার/ ভাবনার বাস্তবিক আছে অধিকার / পরাধীন বন্দীভাবে রয়ছ যখন ।" পিঞ্জরে বসিয়া শুককে লেখিকার পরাধীন নারী বলে মনে হয়েছে । এই পরাধীন নারীদের জন্যে তিনি যে কতটা কাতর ছিলেন তাঁর লেখা পড়লেই তা বুঝতে পারা যায় । বিধবাদের নিয়ে তাঁর বেশ কিছু লেখা এই বইয়ে জায়গা পেয়েছে । এই প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন " গত দেড়শ বছর ধরে বাঙলা সাহিত্যে বিধবাদের নিয়ে লেখার আর শেষ নেই । কোথাও নিছক ভক্তির উচ্ছ্বাস ,কতক -বা তার সামাজিক ক্লেশ ও মর্যাদাহানির কথা , কোথাও সংসারে তার দেবীত্ব নয় দাসীত্ব, তার নিরাপত্তার অভাব আর আর্থিক দুর্গতি ।এ ছাড়া তার সঙ্গে বিচিত্র আর জটিল অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি সাত- সতেরো নিয়ে বহু উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্ট গল্প উপন্যাস আমরা পড়েছি । গল্প - উপন্যাসেই পাওয়া যায় এমন বেশ কিছু জ্যান্ত চরিত্র কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করে ছোটবেলা থেকেই আমি বিধবাদের জীবনযাত্রার দিকে আকৃষ্ট হই। " সত্যিতো , বিশেষ করে সেকালে বিধবাদের মত পরাধীন , বঞ্চিত , লাঞ্ছিত ,অসহায় আর কে? কল্যানী দত্তর এক চরিত্রের নাম শিবমোহিনী ।বালবিধবা শিবমোহিনীর দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়েছিলো বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে , যদিও কয়েকটি সন্তানসহ বিপত্নীক একজনের ঘরণী হয়েছিলেন তিনি , তবু মোটের ওপর সুখীই হয়েছিলেন মনে করা যায় । এই শিবমোহিনীর একটি উক্তির এখানে উল্লেখ করেছেন লেখিকা -"মানুষ গরুকে দেয়, কাককে দেয়, গাছকে দেয় , শিয়ালকে দেয়, কিন্তু বিধবাদের কিছু পাওয়ার নেই ।" চোদ্দবছর বয়সে গর্ভিণী অবস্থায় বিধবা হয়ে বাপের বাড়ী ফিরে আসা এক কিশোরীর কথা লিখেছেন লেখিকা । সেসময় একদশী করতে হত নির্জলা । সে যাতে স্নান করার সময় লুকিয়ে জল না খায় তাই একাদশীর দিন পুকুরে স্নান করতে দেওয়া হতনা । তোলা জলে দাসীর পাহারায় স্নান করতে হত । দাসী নজর রাখত মেয়ে জল খাচ্ছে কিনা । ঘটনা চক্রে মেয়েটির প্রসব বেদনা উঠলো গ্রীষ্মের একদশীর দিন । পিপাসায় কাতর মেয়েটি জলের জন্য ছটফট করতে থাকে ,তাকে এক ফোঁটা জলও দেওয়া হয়নি । সারারাত কষ্ট পাওয়ার পর পরদিন সকালে সে একটি মৃত পুত্রসন্তান প্রসব করে । একজনের নাম ছিল ইন্দুমতী । ছোটোখাটো জমিদার বংশের আদরের মেয়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পরে প্রথমটা কিছু বুঝতে পারেনি ,পরে যখন বুঝলো নিজেই শাড়ির পাড় ছিঁড়ে ফেলল ,সমস্ত গয়না খুলে ফেলল ,নাকের নোলক টেনে খুলতে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাল। চেনা নাপিতকে দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ফেলল । বাড়ির সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ।কারন এ সমস্তই বিধবাদের করতে হয় ।এভাবেই থাকতে হয় বিধবাদের । বয়স তখন বারো থেকে চোদ্দ বছর মাত্র । এরপর ইন্দুমতী শ্বশুর বাড়ী চলে যায় । সেখানে সম্পত্তি্র আটআনার অংশীদার ছিল সে । কিছুদিন শ্বশুরবাড়ি থাকার পর তাকে কাশীতে পাঠিয়ে দেওয়া হল একশ' টাকা মাসহারা ঠিক করে । ছ' মাসের মধ্যে কমতে কমতে এসে দাঁড়ালো দশ টাকায় । ইন্দুমতী বলেছে আগে অনেক আচার বিচার ছিল , সব জায়গায় খাওয়া দাওয়া করতনা , কার ছোঁয়া পড়বে সেই ভয়ে । এরপর ইন্দুমতীর নিজের কথা "সেই আমি এখন যেদিন জোটেনা ছত্তরের ভাত খাই । যে ডাকে তার বাড়ীতেই যাই । " এরপর একজনের কথা । যার বিয়ে হয়ত হয়েছিল থালায় বা কুলোয় করে ।কারন তাকে আমরা যখন দেখি , তখন সে রান্নাঘরের একদিকে বসে মার হাতে ভাত খাচ্ছে বিধবা অবস্থায়। বয়স পাঁচ কি ছয় । দূরে বসে ভাইএরা মাছ ভাত খাচ্ছে বোনকে বলছে " তোর মাছ নেই ।" মেয়ে মাকে প্রশ্ন করলে মা ডালের বড়া দেখিয়ে বলছেন "এইত তোমার মাছ ।" মেয়ে তাতেই খুশী । এই ছলনা বেশ কিছুদিন চলেছিল । তারপর একদিন মেয়েটি সব বুঝতে পারে ।আর সে মাছ চায়নি । কবি রসরাজ অমৃতলাল বসুর কবিতা দিয়ে এই লেখা শেষ করব ।লেখিকা লিখছেন , অমৃতলালের মা মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে বিধবা হন আর কদিন বাদেই তাঁর কলেরা হয় । সদ্যবিধবার একেদশীর ব্রত পালন আর শাস্ত্রমুগ্ধ পরিবার পরিজনের বর্ণনা কবি এভাবে দিয়েছেন । "নগরে নিধাঘ জ্যৈষ্ঠ দিবা দ্বিপ্রহর / বিসূচিকা তৃষা তাতে কত ভয়ঙ্কর / শক্তি বুঝিবারে বুঝি সদ্যবিধবার / সেইদিন একাদশী পড়েছে আবার ।/ ভিষক আসিয়া গেল লিখিয়া ঔষধ / একে একাদশী তায় ডাক্তারের মদ /। উড়িল ব্যবস্থাপত্র বাতাসে উঠানে , / কাকীমা জলের ফোঁটা দেন মার কানে । / পাথরে রাখিয়া জল উদরে বসায় / জননী জীবন পান ঈশ্বর কৃপায় ।।/ পবিত্র প্রতিমা হেন নাহিক ধরায় / বঙ্গের বিধবা পাশে দেবী হেরে যায় ।/ ভেঙ্গো না প্রতিমা চারু , মুছো না এ ছবি ।/ গলায় কাপড় দিয়ে পায়ে ধরে কবি । আজ আর বিধবাদের সে অবস্থা নেই । সমাজ অনেক উদার ,সংস্কার মুক্ত ।কিন্তু কে বলতে পারে সেই ইন্দুমতী , সেই ডালের বড়াকে মাছ ভাবা ,সেই মৃত সন্তানের জন্ম দেওয়া মেয়েটি আমার কিম্বা তোমার কেউ হতোনা ! Reply Forward গুরুচন্ডা৯ guruchandali@gmail.com Sep 11


No comments:

Post a Comment