বাড়িতে বাসন মাজতে ,ঘর মুছতে আসত কালিদাই। গায়ের রঙ খুব কালো ছিল বলে মনে হয় সবাই ওকে ওই নামে ডাকতো । মাঝ বয়সী ,রোগা চেহারা ,সামনে আঁচল করে শাড়ী পরা, গলায় মোটা রুপোর হাঁসুলি ,গলায়, হাতে, পায়ে এমন কি কপালেও উল্কি করা ,দু কানের লতি মাঝখান থেকে কাটা মনে হয় ভারি গয়না পরার ফল ।অনেক পুরন লোক হওয়াতে খুব দাপট ছিল ,কথায় কথায় আমাদের ভয় দেখাত পিসিমাকে নালিশ করবে ।
আসতো রাজিয়া ,কালিদাইয়ের মেয়ে খুব শক্তপোক্ত চেহারা । ও আমাদের বাড়ির চাল, গম ঝাড়ত বাছত । একটা যাঁতা বসান ছিল একটা ঘরে সেটাতে ছোলার ছাতু, যবের ছাতু পিষত ,উদুখলে কিসব কুটত । রাজিয়ার ছেলে গন্নি আমাদের বাড়ির আর ডিস্পেন্সারির ফাই ফরমাস খাটত । পরে অবশ্য কোন অন্য চাকরিতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল ।
রান্নার ঠাকুর আসতো । ,ওর আটামাখা দেখার মত ছিল বিরাট বড় কাঁসিতে ঢিপি করে আটানিয়ে দুহাতে দুমদাম করে কুস্তি করার মত করে ঠাসত । দুপুরে সবার খাওয়া হয়ে গেলে একদম আলাদা খেতে বসত আমরা কেউ কাছে গেলে বকত ,আমরা ছুঁয়ে দিলে ওর খাওয়া নষ্ট হবে কারণ আমরা ব্রমহন নই ।আবার সেই ঠাকুরই রাত্তির বেলা আমি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইলে আমার ভাত মন্দিরের মত করে চূড়া করে তাতে আলু পটল ভাজা সাজিয়ে বলত মন্দির বানিয়ে দিয়েছি ,খেয়ে নাও।
আসতো ছুটকী গয়লানি । রোদে পোড়া কালো রঙ রুক্ষ চুল,মুখে অজস্র আঁকিবুকি ,মিলের আধময়লা সাদা শাড়ি ,হাতে, গলায় ,পায়ে ভারি ভারি রূপোর গয়না আর উল্কি । দু পায়ের পাতার সামনে দুটো ভেতর দিকে বাঁকানো । বাইরের কলে ধুলো মাখা পা ধুয়ে পিসিমার কাছে গিয়ে বসতো । মাথার নিচু কানার ঝুড়ি নামাত ,অনেক গুলো দুধের কেঁড়ে সেটাতে ,পিসিমা সিংহাসন এ বসে হাঁটুর ওপরে কেঁড়ে বসিয়ে নিজের হাতে দুধ মেপে নিত ।
বিকেলের দিকে আসতো কারুয়ার মা ,নাপতিনী । ছোটখাট ,ফোকলা মুখে হাসি ভরা ।
হাতের পুঁটলিতে ঝামা, নরুন,আলতার পাতা, ছোট পেতলের বাটি। বড়োরা বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসত ও উঠোনে বসে ঝামা দিয়ে পা ঘষে ,নখ কেটে আলতা পরিয়ে দিত ।আমাদের শুধু নখ কেটে দিত ,মিশনারি স্কুলে পড়তাম কড়া ডিসিপ্লিন আলতা পরা নেল পলিশলাগান একদম বারন। লম্বা ছুটিতে আলতা পরতাম কারুয়ার মা পায়ের পাতায় নানান ডিজাইন করে মনের সুখে আলতা পরাত।
একজন গুড় ওয়ালা আসতো বাঁকে গুড়ের টিন ঝুলিয়ে । বড় টিকি ছিল মাথায় ,আমরা ওকে দেখলে বলতাম " টিক্কি মে রাধাকিষান "' ও অমনি বলত" নেহি নেহি সিতারাম বোল " রাধাকিষান এর বদলে সিতারাম বলতে হবে কেন বুঝতামনা ,বলতামওনা ।
আমদের বুড়ো পুরুতমশাই মারা গেলেন , ওঁর ছেলে দুর্গাচরণ আসতো পুজো করতে ,একটু পাগলাটে ,খেতে খুব ভালোবাসত ,পুজো করতে পারতনা ঠিক করে বকুনি খেয়ে খেয়ে পুজো করত। পুজো করা হয়ে গেলে ছোটোকাকিমা যত্ন করে খাওয়াত।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
No comments:
Post a Comment