Tuesday, 13 December 2011

আমাদের শহরের শীত গ্রীষ্ম ///// by Madhuchhanda Paul on Monday, December 12, 2011 at 3:18pm বিহারে আমাদের শহরে শীত আর গ্রীষ্ম দুটোই খুব প্রবল ভাবে আসতো । এখন যেমন কলকাতাতেও খুব বেশী গরম পড়ে আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু আমরা তেমন দেখিনি । কলকাতার গরম মোটামুটি সহ্য করার মত ছিল । আর আমাদের তো গরম তেমন লাগতইনা ,আমাদের শহরের তুলনায় গরম কম পড়ত বলেই হয়তো ! গরমের ছুটি পড়ার আগে বেশ কিছুদিন মর্নিং স্কুল হত । বেলা সাড়ে দশটায় ছুটি হয়ে যেতো স্কুল । দুপুরে বাড়ীর সবাই তাড়াতাড়ি কাজকর্ম মিটিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত । সারা দুপুর লু চলত গরম হাওয়ার , সঙ্গে ধুলো উড়ত চারিদিক অন্ধকার করে । আওয়াজ হত হূঊ.................................। যখন ছোট ছিলাম, মনে আছে - ছোটকাকীমা আমাকে তার উঁচু খাটে তুলে দিয়ে , খেলনার আলমারি থেকে (তখন ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত । খেলার করার বয়স যায়নি তখনও । সঙ্গে অনেক খেলনা দেওয়া হত । একটা আলমারিও খেলনা রাখার জন্যে । আমার মারও ছিল । ) খেলনা বার করে দিয়ে ঘর থেকে বেরতে বারন করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যেত । যখন আরও খানিকটা বড় হয়েছি আমাদের এক জ্যাঠতুত দাদা খুব রাশভারী লালুদা।প্রায় আমার বাবার কাছাকাছি বয়স ।চেম্বার থেকে বাড়ী এসে আমাদের মানে আমরা যত জন ছোট আছি সবাইকে তার ঘরে ঢোকাত । নিজে থাকতো খাটে আর আমরা বড় সতরঞ্চিরতে মাটিতে । কেউ কারো দিকে ফিরে শোবেনা , কথা বলবেনা । আমরা মেয়েরা একদিকে শুতাম , আমাদের নিয়ে সমস্যা ছিলনা । ছেলে গুলো কথা বলত । মাঝে মাঝে লালুদার হুঙ্কার শোনা যেতো “কে কথা বলছে ? দেয়ালে মাথা ভটাভট করে ঠুকে দেবো।” অবশ্য কখনও কাউকে শাস্তি দেয়নি । হুঙ্কারেই কাজ হতো। আমরা বড় হওয়ার পর লালুদার এই কথাটা নিয়ে হাসাহাসি করেছি । দুপুরটা ঘরে আটকে রাখা জরুরী ছিল ।বাইরে বেরোলে লু লেগে যাওয়ার ভয় । বিকেলে ঘর থেকে বেরোলে দেখতাম , বারান্দার মাঝখান দিয়ে হাওয়া বয়ে গেছে আর বারান্দার দুপাশে হাওয়ার সঙ্গে আসা ধুলো জমে আছে ঢিপি করে । বিকেলে বারান্দা ধুতে হতো। রাতে আমরা অনেকেই ছাদে শুতাম । দুদিকে দুটো ছাদ ছিল । ছোট ছাদে বাড়ীর ছেলেরা আর অন্যটায় আমরা মেয়েরা শুতাম । সন্ধ্যেবেলা ছাদে বালতি বালতি জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হতো। মা কখনই ছাদে শুতনা পিসিমাও না। ছোটকাকীমা , জ্যাঠাইমা, বড়বৌদি এরকম আরও কারো সঙ্গে ঘুমতাম আমরা । দূষণ ছাড়া পরিস্কার আকাশ । নক্ষত্র পরিস্কার দেখা যেতো । কালপুরুষ , সপ্তর্ষি মণ্ডল ।পুর্নিমার কাছাকাছি এলে চাঁদের আলো এতো জোরাল হতো যে মনে হতো জোর পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । একবার কোন একটা ধুমকেতু দেখা গিয়েছিল ক’দিন ধরে মনে পড়ে । গরম কালের মজা ছিল আম খাওয়া । ভাঁড়ার ঘরের চৌকির তলায় শ’ দরে কেনা আম চটের ওপর বিছিয়ে রাখা থাকতো । রোজ সকালে পিসীমা সেখান থেকে তৈরী আম বেছে রান্নার বালতির জলে ভিজিয়ে রাখতো । তারপর সময় মত বোঁটার দিক থেকে খানিকটা কেটে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিত ,আমরা ছাড়িয়ে খেয়ে নিতাম ।একরকম ছোট আম খেয়েছি , বলতাম বিজু । পাকা আম ফুটো করে চুষে খেতে হতো । ছোটকাকীমা কাঁচা আম ছেঁচে কাসুন্দি আরও কিছু দিয়ে মেখে দিয়ে যেতো শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে তার মধ্যে করে । না চাইতেই । মনে আছে এই সময় ঝুড়ি করে আম পাঠানো হতো বিভিন্ন কুটুম বাড়ীতে । অনেক বছর পর কলকাতায় আমার দিদির শ্বশুরমশাই হাতে একটা আম দিয়ে বলেছিলেন “ তোমাদের দেশের আম , আঁটী পুঁতেছিলাম । বেশী ফলেনা কিন্তু খুব মিষ্টি ।’’ শীতও আসতো খুব দাপটের সঙ্গে । মোটামুটি কালীপূজোর সময় থেকেই ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । কার্ত্তিক মাসে নাকি লেপ বার করতে নেই তাই আশ্বিন মাসেই একবার লেপ গায়ে দিয়ে রাখা হতো । তার মানে কার্ত্তিক মাসেই লেপ গায়ে দেবার মত ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । হূ...হূ করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিত উত্তর থেকে । ঠোঁট ফেটে যেতো মনে পড়ে । মা সারাক্ষণ চটি পায়ে দাও আর গরম জামা পরো বলে হাঁকা হাঁকি করতো । ঐ দুটো জিনিষই পরতে ভালো লাগতনা । বড়দিনের ছুটি বেশ লম্বা হতো । আমরা প্রায় সারাদিন ছাদে রৌদ্রে থাকতাম । দুপুর বেলা ছাদে মাদুর পেতে মাথায় বালিশ দিয়ে জ্যাঠাইমা বেশ আয়েশ করে শুত আর ছোট কাকীমা গল্পের বই পড়ে শোনাত ।এই দৃশ্য রোজকার ছিল । আর আমি ছোটোকাকীমার একটু লালচে লম্বা চুল নিয়ে খেলা করতাম । চারগুছির বিনুনি করতাম , দুটো বিনুনি করতাম । কোনদিন একটুও আপত্তি করেনি , বিরক্ত হয়নি । কোনদিন লুডো খেলতাম । দিদি বউদিরা বুনত , সেলাই করতো ।গল্প করতো । বড় বৌদি মাঝে মাঝে উঠে খানিক পায়চারি করে নিত নইলে ঘুম পায় আর সবাই জানে দুপুরে ঘুমলে মোটা হয়ে যায় লোকে ! সকালে ছুটকি গয়লানি দুধ নিয়ে আসতো কেঁড়েতে করে তার ওপরে মাঠ্‌টা জমে থাকতো পুরু হয়ে । পিসিমা গোল গোল করে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে আমাদের দিত । অমৃত । শীতের সময় কোন কোন বার পিকনিক করতে যাওয়া হতো ।বেশীর ভাগই দাদাদের কোন পেসেন্টের বাগান বাড়িতে । বিরাট বড় দল ।দাদাদের বন্ধুরা থাকতো তাদের পরিবার নিয়ে ।আর যেতাম মন্দার হিল । বাসে করে বংশীতে গিয়ে নামলেই সামনে পাহাড় দেখা যেতো ,মনে হতো এক দৌড়ে পৌঁছে যাব কিন্তু আসলে দুরত্ব অনেকটাই । একটা দুটো গরুর গাড়ী ভাড়া করা হতো । কেউ হাঁটত কেউ গরুর গাড়ীতে উঠত । বাস থেকে নেমে হাটিয়া থেকে চাল ডাল মাটীর হাঁড়ী ইত্যাদি কিনে নেওয়া হতো । খিচুড়ি রেঁধে খাওয়ার জন্যে । মন্দার হিলে দেখার মত অনেক জায়গা ছিল । বলা হয়ে থাকে সমুদ্র মন্থনের সময় এই মন্দার পাহাড় হয়েছিল মন্থন দণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু । চিহ্ন স্বরূপ পাহাড়ের গায়ে সাপের আঁশের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় । পাহাড়ের গায়ে অনেক উঁচুতে একটি অপূর্ব নিখুঁত মুখ খোদাই করা আছে । ওটা নাকি বিষ্ণুর মুখাকৃতি ,বিশ্বকর্মার শিল্প কীর্তি। সাধারণ মানুষের পক্ষে অত উঁচুতে কাজটী করা সম্ভব বলে মনে হয়না। এছাড়া আছে আকাশ গঙ্গা । পাহাড়ের ওপরে একটি গুহা । গুহার ভেতরে একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে , শেষ দেখা যায়না । সেটা বিশেষ বিশেষ সময় জলে ভরে যায় ।আর ছিল কিছু জলের কুণ্ড পাহাড়ের ওপর , পরিষ্কার টলটলে জল ভরা । কতো কথা মনে পড়লো লিখতে গিয়ে । আমরা বলতাম “মান্দার হিল”। এখন নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে সব । হয়তো ভালো রাস্তা হয়েছে , আলো হয়েছে ,গরুর গাড়ী করে যেতে হয়না আর ।অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় “ মান্দার হিলে । ” আমার কিন্তু সেই মাটির অসমান রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথাই মনে পড়বে গরুর গাড়ী করে ঝাঁকুনি খেতে খেতে সন্ধের মুখে ফিরে চলা । গরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজ ঠং ঠং ! ````````````````````````````````````````আমাদের শহরের শীত গ্রীষ্ম ///// by Madhuchhanda Paul on Monday, December 12, 2011 at 3:18pm বিহারে আমাদের শহরে শীত আর গ্রীষ্ম দুটোই খুব প্রবল ভাবে আসতো । এখন যেমন কলকাতাতেও খুব বেশী গরম পড়ে আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু আমরা তেমন দেখিনি । কলকাতার গরম মোটামুটি সহ্য করার মত ছিল । আর আমাদের তো গরম তেমন লাগতইনা ,আমাদের শহরের তুলনায় গরম কম পড়ত বলেই হয়তো ! গরমের ছুটি পড়ার আগে বেশ কিছুদিন মর্নিং স্কুল হত । বেলা সাড়ে দশটায় ছুটি হয়ে যেতো স্কুল । দুপুরে বাড়ীর সবাই তাড়াতাড়ি কাজকর্ম মিটিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত । সারা দুপুর লু চলত গরম হাওয়ার , সঙ্গে ধুলো উড়ত চারিদিক অন্ধকার করে । আওয়াজ হত হূঊ.................................। যখন ছোট ছিলাম, মনে আছে - ছোটকাকীমা আমাকে তার উঁচু খাটে তুলে দিয়ে , খেলনার আলমারি থেকে (তখন ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত । খেলার করার বয়স যায়নি তখনও । সঙ্গে অনেক খেলনা দেওয়া হত । একটা আলমারিও খেলনা রাখার জন্যে । আমার মারও ছিল । ) খেলনা বার করে দিয়ে ঘর থেকে বেরতে বারন করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যেত । যখন আরও খানিকটা বড় হয়েছি আমাদের এক জ্যাঠতুত দাদা খুব রাশভারী লালুদা।প্রায় আমার বাবার কাছাকাছি বয়স ।চেম্বার থেকে বাড়ী এসে আমাদের মানে আমরা যত জন ছোট আছি সবাইকে তার ঘরে ঢোকাত । নিজে থাকতো খাটে আর আমরা বড় সতরঞ্চিরতে মাটিতে । কেউ কারো দিকে ফিরে শোবেনা , কথা বলবেনা । আমরা মেয়েরা একদিকে শুতাম , আমাদের নিয়ে সমস্যা ছিলনা । ছেলে গুলো কথা বলত । মাঝে মাঝে লালুদার হুঙ্কার শোনা যেতো “কে কথা বলছে ? দেয়ালে মাথা ভটাভট করে ঠুকে দেবো।” অবশ্য কখনও কাউকে শাস্তি দেয়নি । হুঙ্কারেই কাজ হতো। আমরা বড় হওয়ার পর লালুদার এই কথাটা নিয়ে হাসাহাসি করেছি । দুপুরটা ঘরে আটকে রাখা জরুরী ছিল ।বাইরে বেরোলে লু লেগে যাওয়ার ভয় । বিকেলে ঘর থেকে বেরোলে দেখতাম , বারান্দার মাঝখান দিয়ে হাওয়া বয়ে গেছে আর বারান্দার দুপাশে হাওয়ার সঙ্গে আসা ধুলো জমে আছে ঢিপি করে । বিকেলে বারান্দা ধুতে হতো। রাতে আমরা অনেকেই ছাদে শুতাম । দুদিকে দুটো ছাদ ছিল । ছোট ছাদে বাড়ীর ছেলেরা আর অন্যটায় আমরা মেয়েরা শুতাম । সন্ধ্যেবেলা ছাদে বালতি বালতি জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হতো। মা কখনই ছাদে শুতনা পিসিমাও না। ছোটকাকীমা , জ্যাঠাইমা, বড়বৌদি এরকম আরও কারো সঙ্গে ঘুমতাম আমরা । দূষণ ছাড়া পরিস্কার আকাশ । নক্ষত্র পরিস্কার দেখা যেতো । কালপুরুষ , সপ্তর্ষি মণ্ডল ।পুর্নিমার কাছাকাছি এলে চাঁদের আলো এতো জোরাল হতো যে মনে হতো জোর পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । একবার কোন একটা ধুমকেতু দেখা গিয়েছিল ক’দিন ধরে মনে পড়ে । গরম কালের মজা ছিল আম খাওয়া । ভাঁড়ার ঘরের চৌকির তলায় শ’ দরে কেনা আম চটের ওপর বিছিয়ে রাখা থাকতো । রোজ সকালে পিসীমা সেখান থেকে তৈরী আম বেছে রান্নার বালতির জলে ভিজিয়ে রাখতো । তারপর সময় মত বোঁটার দিক থেকে খানিকটা কেটে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিত ,আমরা ছাড়িয়ে খেয়ে নিতাম ।একরকম ছোট আম খেয়েছি , বলতাম বিজু । পাকা আম ফুটো করে চুষে খেতে হতো । ছোটকাকীমা কাঁচা আম ছেঁচে কাসুন্দি আরও কিছু দিয়ে মেখে দিয়ে যেতো শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে তার মধ্যে করে । না চাইতেই । মনে আছে এই সময় ঝুড়ি করে আম পাঠানো হতো বিভিন্ন কুটুম বাড়ীতে । অনেক বছর পর কলকাতায় আমার দিদির শ্বশুরমশাই হাতে একটা আম দিয়ে বলেছিলেন “ তোমাদের দেশের আম , আঁটী পুঁতেছিলাম । বেশী ফলেনা কিন্তু খুব মিষ্টি ।’’ শীতও আসতো খুব দাপটের সঙ্গে । মোটামুটি কালীপূজোর সময় থেকেই ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । কার্ত্তিক মাসে নাকি লেপ বার করতে নেই তাই আশ্বিন মাসেই একবার লেপ গায়ে দিয়ে রাখা হতো । তার মানে কার্ত্তিক মাসেই লেপ গায়ে দেবার মত ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । হূ...হূ করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিত উত্তর থেকে । ঠোঁট ফেটে যেতো মনে পড়ে । মা সারাক্ষণ চটি পায়ে দাও আর গরম জামা পরো বলে হাঁকা হাঁকি করতো । ঐ দুটো জিনিষই পরতে ভালো লাগতনা । বড়দিনের ছুটি বেশ লম্বা হতো । আমরা প্রায় সারাদিন ছাদে রৌদ্রে থাকতাম । দুপুর বেলা ছাদে মাদুর পেতে মাথায় বালিশ দিয়ে জ্যাঠাইমা বেশ আয়েশ করে শুত আর ছোট কাকীমা গল্পের বই পড়ে শোনাত ।এই দৃশ্য রোজকার ছিল । আর আমি ছোটোকাকীমার একটু লালচে লম্বা চুল নিয়ে খেলা করতাম । চারগুছির বিনুনি করতাম , দুটো বিনুনি করতাম । কোনদিন একটুও আপত্তি করেনি , বিরক্ত হয়নি । কোনদিন লুডো খেলতাম । দিদি বউদিরা বুনত , সেলাই করতো ।গল্প করতো । বড় বৌদি মাঝে মাঝে উঠে খানিক পায়চারি করে নিত নইলে ঘুম পায় আর সবাই জানে দুপুরে ঘুমলে মোটা হয়ে যায় লোকে ! সকালে ছুটকি গয়লানি দুধ নিয়ে আসতো কেঁড়েতে করে তার ওপরে মাঠ্‌টা জমে থাকতো পুরু হয়ে । পিসিমা গোল গোল করে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে আমাদের দিত । অমৃত । শীতের সময় কোন কোন বার পিকনিক করতে যাওয়া হতো ।বেশীর ভাগই দাদাদের কোন পেসেন্টের বাগান বাড়িতে । বিরাট বড় দল ।দাদাদের বন্ধুরা থাকতো তাদের পরিবার নিয়ে ।আর যেতাম মন্দার হিল । বাসে করে বংশীতে গিয়ে নামলেই সামনে পাহাড় দেখা যেতো ,মনে হতো এক দৌড়ে পৌঁছে যাব কিন্তু আসলে দুরত্ব অনেকটাই । একটা দুটো গরুর গাড়ী ভাড়া করা হতো । কেউ হাঁটত কেউ গরুর গাড়ীতে উঠত । বাস থেকে নেমে হাটিয়া থেকে চাল ডাল মাটীর হাঁড়ী ইত্যাদি কিনে নেওয়া হতো । খিচুড়ি রেঁধে খাওয়ার জন্যে । মন্দার হিলে দেখার মত অনেক জায়গা ছিল । বলা হয়ে থাকে সমুদ্র মন্থনের সময় এই মন্দার পাহাড় হয়েছিল মন্থন দণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু । চিহ্ন স্বরূপ পাহাড়ের গায়ে সাপের আঁশের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় । পাহাড়ের গায়ে অনেক উঁচুতে একটি অপূর্ব নিখুঁত মুখ খোদাই করা আছে । ওটা নাকি বিষ্ণুর মুখাকৃতি ,বিশ্বকর্মার শিল্প কীর্তি। সাধারণ মানুষের পক্ষে অত উঁচুতে কাজটী করা সম্ভব বলে মনে হয়না। এছাড়া আছে আকাশ গঙ্গা । পাহাড়ের ওপরে একটি গুহা । গুহার ভেতরে একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে , শেষ দেখা যায়না । সেটা বিশেষ বিশেষ সময় জলে ভরে যায় ।আর ছিল কিছু জলের কুণ্ড পাহাড়ের ওপর , পরিষ্কার টলটলে জল ভরা । কতো কথা মনে পড়লো লিখতে গিয়ে । আমরা বলতাম “মান্দার হিল”। এখন নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে সব । হয়তো ভালো রাস্তা হয়েছে , আলো হয়েছে ,গরুর গাড়ী করে যেতে হয়না আর ।অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় “ মান্দার হিলে । ” আমার কিন্তু সেই মাটির অসমান রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথাই মনে পড়বে গরুর গাড়ী করে ঝাঁকুনি খেতে খেতে সন্ধের মুখে ফিরে চলা । গরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজ ঠং ঠং ! ````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````



Saturday, 3 December 2011

উর্দুবাজারের বাড়ী শহরের বাইরে বাবা একটা ছোট বাড়ী করেছিল । প্রায় এক বিঘে জমির ওপর গোটা দুই বেশ বড়ো ঘর ।বড়ো চওড়া বারান্দা , মোটামুটি বড়ো উঠোনের একদিকে রান্নাঘর , অন্যদিকে বাথরুম ইত্যাদি । আর বাকি জমিতে কাগজি লেবু, পেয়ারা এই রকম কিছু গাছ । আর দুটো খুব বড় রক্তকরবীর ঝোপ । বাকিটা খালি পড়ে থাকা জমি । একটা অনেক বড় গাছ ছিল ছিল , সেটাকে আমরা জিওল গাছ বলতাম । গাছটা ছিল কুঁয়োর পাড়ে । ছোট ছোট ডাল পাতা সমস্ত ছাঁটা । বেশ ওপরে ইংরেজী ভি অক্ষরের মত দুটো ডাল তার মাঝখান দিয়ে একটা প্রমান মাপের বাঁশ পার করিয়ে দেওয়া , মোটা দিকটায় একটা বস্তায় বালি ভরে বাঁধা ,ভারী করার জন্যে আর সামনের দিকটায় একটা লম্বা দড়ির আগায় একটা বালতি জাতীয় কিছু বাঁধা ,ঠিক বালতি নয় তলাটা দুদিক থেকে এসে সরু হয়ে গেছে । ওটা ছিল কুঁয়ো থেকে জল তোলার জন্যে ।দড়িটা ধরে টেনে জলের পাত্রটাকে কুঁয়োয় ডুবিয়ে দিলে জল ভরে যাওয়ার পর পরিশ্রম ছাড়াই জল শুদ্ধ পাত্রটা ওপরে উঠে আসে। এটাকে লাটাখাম্বা বলতাম । উর্দুবাজারের বাড়ীতে কলের জল ছিলনা ,কাজের লোক ওইভাবে জল তুলে কলঘরের চৌবাচ্চা ভরে রাখতো ।জমিতে জল দিত। ইলেকট্রিকের আলো ছিলনা । হ্যরিকেন জ্বলত । আমরা তিন ভাই বোন আর মা থাকতাম আর আমাদের লোম ওয়ালা , লম্বা কানের টোগো । দিদিও আসতো শ্বশুরবাড়ি থেকে । বেশ আনান্দেই কাটত সময় । আমরা সেই বাড়িতে মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতাম । কোনকিছু না থাকা গায়েই লাগতনা । একবার প্রায় ১ বছর ছিলাম ওখানে ।মার শরীর খারাপ যাচ্ছিল । খোলা মেলা পরিবেশে থাকার জন্যে গিয়ে- ছিলাম । ওখান থেকেই স্কুল করেছি ।কিছুদুর গিয়ে রিক্সা পাওয়া যেত। সেবার শীতকালে দাদাএক বন্ধুকে নিয়ে এসে তুলল বাড়িতে, নাম সুধাংশু ।তখন বোধহয় দাদার বয়স ১৭/১৮ হবে । শুধাংশুদা অনেকটাই বড় দাদার থেকে । টি . বি হয়েছে তার । দুস্থ খুব ।আমাদের বাড়ীতে থাকবে । পুষ্টিকর খাবার খাবে আর আমাদের জ্যাঠতুত দাদাদের দিয়ে চিকিৎসা করাবে । আর সব কিছুতে রাজী হলেও মা বাড়ীতে থাকতে দেওয়ার ব্যপারে একবারে বেঁকে বসলো । এক বাড়ীতে ঐ রকম ছোঁয়াচে রুগীকে মা থাকতে দিতে রাজী হলনা । শৈশবে পিতৃহীন সন্তানদের ওপর , বিশেষ করে দাদার ওপর মার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল ।অনেক সময় অনেক অন্যায্য কথা মেনে নিলেও এ বারে মা অনড়। একবারে জমির শেষ প্রান্তে একটা টালির ঘর ছিল যদি কখনও মালি রাখা হয় মনে করে , যদিও রাখার দরকার হয়নি বাইরে থেকে এসে কাজ করে দিত চাষি । ঘরটা ভালোই । শুকনো খটখটে । খোলামেলা তো ঐখানে মা ব্যবস্থা করে দিল থাকার । দাদাও কোথা থেকে একটা দড়ির খাটিয়া জোগাড় করে ওইঘরেই নিজের বিছানা পাতলো । মা কিছুই বললনা ।কিন্তু পুষ্টিকর খাওয়া দাওয়, খোলামেলা জায়গায় থাকা কিছুতেই কোন উন্নতি হলনা সুধাংশুদার শরীরের । শেষে হাসপাতালে দেওয়া হল । সেখানেই মারা গেলো দাদার সেই বন্ধু । দাদা কদিন গুম হয়ে রইল । কিছুদিন পরে বন্ধুর একটা ছবি বাঁধিয়ে নিয়ে এল । নিচে লেখা “যে ফুল না ফুটিতে/ ঝরিল ধরণীতে / যে নদী .........” খুব অবাক লেগেছিল ।মাত্র ক’দিন আগে দেখাছি , ওদের ঘরের সামনে রোদে বসে দুজনে কথা বলছে বা দাদা পড়ছে , সুধাংশুদা খবরের কাগজ পড়ছে। সেই মানুষটা কিকরে নেই হয়ে গেলো ভেবেপাইনি।


Monday, 28 November 2011

কল্যানী দত্তর পিঞ্জরে বসিয়া , কিছু আলোচনা / মধুছন্দা পাল । Inbox x Madhuchhanda Paul Sep 10 পিঞ্জরে বসিয়া প্রয়াত কল্যানী দত্তর মূলত সেকালের মেয়েদের নিয়ে লেখা বই । বইটির ... Madhuchhanda Paul Sep 10 Loading... Madhuchhanda Paul Sep 10 to গুরুচন্ডা৯ পিঞ্জরে বসিয়া প্রয়াত কল্যানী দত্তর মূলত সেকালের মেয়েদের নিয়ে লেখা বই । বইটির নাম প্রসঙ্গে লেখিকা লিখেছেন "পিঞ্জরে বসিয়া শুক কমলকুমার মজুমদারের একটি উপন্যাস ।কিন্তু এই শব্দগুলি কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় কবির পদ্য থেকে নেওয়া । কবিতাটির প্রথম স্তবকটি এইরকম - পিঞ্জরে বসিয়া শুক, মুদিয়া নয়ন / কি ভাবিছ মনে মনে ? অথবা তোমার/ ভাবনার বাস্তবিক আছে অধিকার / পরাধীন বন্দীভাবে রয়ছ যখন ।" পিঞ্জরে বসিয়া শুককে লেখিকার পরাধীন নারী বলে মনে হয়েছে । এই পরাধীন নারীদের জন্যে তিনি যে কতটা কাতর ছিলেন তাঁর লেখা পড়লেই তা বুঝতে পারা যায় । বিধবাদের নিয়ে তাঁর বেশ কিছু লেখা এই বইয়ে জায়গা পেয়েছে । এই প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন " গত দেড়শ বছর ধরে বাঙলা সাহিত্যে বিধবাদের নিয়ে লেখার আর শেষ নেই । কোথাও নিছক ভক্তির উচ্ছ্বাস ,কতক -বা তার সামাজিক ক্লেশ ও মর্যাদাহানির কথা , কোথাও সংসারে তার দেবীত্ব নয় দাসীত্ব, তার নিরাপত্তার অভাব আর আর্থিক দুর্গতি ।এ ছাড়া তার সঙ্গে বিচিত্র আর জটিল অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি সাত- সতেরো নিয়ে বহু উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্ট গল্প উপন্যাস আমরা পড়েছি । গল্প - উপন্যাসেই পাওয়া যায় এমন বেশ কিছু জ্যান্ত চরিত্র কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করে ছোটবেলা থেকেই আমি বিধবাদের জীবনযাত্রার দিকে আকৃষ্ট হই। " সত্যিতো , বিশেষ করে সেকালে বিধবাদের মত পরাধীন , বঞ্চিত , লাঞ্ছিত ,অসহায় আর কে? কল্যানী দত্তর এক চরিত্রের নাম শিবমোহিনী ।বালবিধবা শিবমোহিনীর দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়েছিলো বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে , যদিও কয়েকটি সন্তানসহ বিপত্নীক একজনের ঘরণী হয়েছিলেন তিনি , তবু মোটের ওপর সুখীই হয়েছিলেন মনে করা যায় । এই শিবমোহিনীর একটি উক্তির এখানে উল্লেখ করেছেন লেখিকা -"মানুষ গরুকে দেয়, কাককে দেয়, গাছকে দেয় , শিয়ালকে দেয়, কিন্তু বিধবাদের কিছু পাওয়ার নেই ।" চোদ্দবছর বয়সে গর্ভিণী অবস্থায় বিধবা হয়ে বাপের বাড়ী ফিরে আসা এক কিশোরীর কথা লিখেছেন লেখিকা । সেসময় একদশী করতে হত নির্জলা । সে যাতে স্নান করার সময় লুকিয়ে জল না খায় তাই একাদশীর দিন পুকুরে স্নান করতে দেওয়া হতনা । তোলা জলে দাসীর পাহারায় স্নান করতে হত । দাসী নজর রাখত মেয়ে জল খাচ্ছে কিনা । ঘটনা চক্রে মেয়েটির প্রসব বেদনা উঠলো গ্রীষ্মের একদশীর দিন । পিপাসায় কাতর মেয়েটি জলের জন্য ছটফট করতে থাকে ,তাকে এক ফোঁটা জলও দেওয়া হয়নি । সারারাত কষ্ট পাওয়ার পর পরদিন সকালে সে একটি মৃত পুত্রসন্তান প্রসব করে । একজনের নাম ছিল ইন্দুমতী । ছোটোখাটো জমিদার বংশের আদরের মেয়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পরে প্রথমটা কিছু বুঝতে পারেনি ,পরে যখন বুঝলো নিজেই শাড়ির পাড় ছিঁড়ে ফেলল ,সমস্ত গয়না খুলে ফেলল ,নাকের নোলক টেনে খুলতে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাল। চেনা নাপিতকে দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ফেলল । বাড়ির সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ।কারন এ সমস্তই বিধবাদের করতে হয় ।এভাবেই থাকতে হয় বিধবাদের । বয়স তখন বারো থেকে চোদ্দ বছর মাত্র । এরপর ইন্দুমতী শ্বশুর বাড়ী চলে যায় । সেখানে সম্পত্তি্র আটআনার অংশীদার ছিল সে । কিছুদিন শ্বশুরবাড়ি থাকার পর তাকে কাশীতে পাঠিয়ে দেওয়া হল একশ' টাকা মাসহারা ঠিক করে । ছ' মাসের মধ্যে কমতে কমতে এসে দাঁড়ালো দশ টাকায় । ইন্দুমতী বলেছে আগে অনেক আচার বিচার ছিল , সব জায়গায় খাওয়া দাওয়া করতনা , কার ছোঁয়া পড়বে সেই ভয়ে । এরপর ইন্দুমতীর নিজের কথা "সেই আমি এখন যেদিন জোটেনা ছত্তরের ভাত খাই । যে ডাকে তার বাড়ীতেই যাই । " এরপর একজনের কথা । যার বিয়ে হয়ত হয়েছিল থালায় বা কুলোয় করে ।কারন তাকে আমরা যখন দেখি , তখন সে রান্নাঘরের একদিকে বসে মার হাতে ভাত খাচ্ছে বিধবা অবস্থায়। বয়স পাঁচ কি ছয় । দূরে বসে ভাইএরা মাছ ভাত খাচ্ছে বোনকে বলছে " তোর মাছ নেই ।" মেয়ে মাকে প্রশ্ন করলে মা ডালের বড়া দেখিয়ে বলছেন "এইত তোমার মাছ ।" মেয়ে তাতেই খুশী । এই ছলনা বেশ কিছুদিন চলেছিল । তারপর একদিন মেয়েটি সব বুঝতে পারে ।আর সে মাছ চায়নি । কবি রসরাজ অমৃতলাল বসুর কবিতা দিয়ে এই লেখা শেষ করব ।লেখিকা লিখছেন , অমৃতলালের মা মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে বিধবা হন আর কদিন বাদেই তাঁর কলেরা হয় । সদ্যবিধবার একেদশীর ব্রত পালন আর শাস্ত্রমুগ্ধ পরিবার পরিজনের বর্ণনা কবি এভাবে দিয়েছেন । "নগরে নিধাঘ জ্যৈষ্ঠ দিবা দ্বিপ্রহর / বিসূচিকা তৃষা তাতে কত ভয়ঙ্কর / শক্তি বুঝিবারে বুঝি সদ্যবিধবার / সেইদিন একাদশী পড়েছে আবার ।/ ভিষক আসিয়া গেল লিখিয়া ঔষধ / একে একাদশী তায় ডাক্তারের মদ /। উড়িল ব্যবস্থাপত্র বাতাসে উঠানে , / কাকীমা জলের ফোঁটা দেন মার কানে । / পাথরে রাখিয়া জল উদরে বসায় / জননী জীবন পান ঈশ্বর কৃপায় ।।/ পবিত্র প্রতিমা হেন নাহিক ধরায় / বঙ্গের বিধবা পাশে দেবী হেরে যায় ।/ ভেঙ্গো না প্রতিমা চারু , মুছো না এ ছবি ।/ গলায় কাপড় দিয়ে পায়ে ধরে কবি । আজ আর বিধবাদের সে অবস্থা নেই । সমাজ অনেক উদার ,সংস্কার মুক্ত ।কিন্তু কে বলতে পারে সেই ইন্দুমতী , সেই ডালের বড়াকে মাছ ভাবা ,সেই মৃত সন্তানের জন্ম দেওয়া মেয়েটি আমার কিম্বা তোমার কেউ হতোনা ! Reply Forward গুরুচন্ডা৯ guruchandali@gmail.com Sep 11


Friday, 25 November 2011

আমাদের উৎসব /// বছরে এক দুবার দিদি বউদিরা হয়তো আঁতুড় ঘরে যেতো । দুতলার গোটা দুই ঘর খালিই পড়ে থাকতো , তারই একটা হত আঁতুড় ঘর ।প্রসব করানোর জন্যে আসতো মিস অ্যানি ,মিস টিরকি বা মিসেস চক্রবর্তী ।অ্যানি আর টিরকি গোলগাল হাসিখুশি লম্বা ঝুলের ফ্রক পরা ।মিসেস চক্রবর্তী চটপটে ,খটখটে মহিলা , মুখের কোন আগলনেই ,যার তার সামনে যা খুশি বলে । জন্মের ছ'দিন পর বাচ্চার মাথার কাছে রাখা হত লাল কালি ভর্তি দোয়াত আর খাগের কলম ,ষষ্ঠীঠাকরুন জাতকের কপালে তার ভাগ্য লিখে দেন সেদিন । আট দিনেরদিন আটকড়াই , যদি ছেলে জন্মে থাকে তবেই ।বাড়ির কোন একজন একটা কুলো উলটো করে ধরবে আর আটটা বাচ্চা ছেলে কাঠি দিয়ে সেই কুলো বাজাচে"আর বলবে "আটকৌড়ে বাটকৌড়ে / ছেলে আছে ভালো ?" ছেলের ঘর থেকে কেউ বলবে "ভালো আছে।" তারপর ছোটরা পাবে আটরকম কড়াই ভাজা নকুলদানা মেশানো আর দুআনা পয়সা । এরপর মেয়ে হলে একমাসে আর ছেলে হলে একুশ দিনে ষষ্ঠীপুজো সেদিন বাড়িতে বেশ লোকজন আসতো । ো বছরে বেশ কয়েকটা লক্ষ্মীপুজো হত আমাদের বাড়িতে । আমাদের লক্ষ্মী ধান দিয়ে তৈরি হত । জলচৌকির ওপর চুড়ো করে ধান দিয়ে তার ওপর একটা কুনকে বসিয়ে চেলির টুকরো দিয়ে ঢেকে লক্ষ্মী হত ।জলচৌকির ওপর সব রকম গয়না আঁকা হত । কাঠের পেঁচা সিঁদুর কৌটো দেওয়া হত । ঠাকুরের আসন থেকে চৌকাঠ অবধি আল্পনা আর লক্ষীর পা আঁকা হত ,এই কাজে আমাদেরও অধিকার ছিল । বাটিতে ঘন করে গোলা পিটুলি আর তুলো নিয়ে তিনতলা থেকে একতলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীরপা আর আল্পনা এঁকে বেড়াতাম । কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হতনা আমাদের বাড়িতে । কালীপুজর দিন মহালক্ষ্মীর পুজো হত । ঘুঁটে দিয়ে তৈরি অলক্ষ্মীকে বিদায় করে চাল বাটা দিয়ে তৈরি হলুদ রঙের লক্ষ্মী, নীল রঙের নারায়ণ আর সাদা কুবের কে বাড়িতে আনা হত বরণ করে । বিজয়াদশমী বেশ বড় করে পালন করা হতো । পুরনো বাঙ্গালী পরিবার বলে অনেকেই আসতেন ।অনেক খাবার দাবার বানানো হত । পিসিমা তার বিশেষ জায়গায় বসে থাকতো । আমারা কাছে গিয়ে বসে লালকালি আর খাগের কলম দিয়ে দুর্গানাম লিখতাম ,পিসিমা মুখে একটু সিদ্ধির সরবত ঢেলে দিত । আসলে সরবত করত আমাদের ছোটকাকিমা বেশি করে আর রাতের দিকে আমার মা ছোটকাকিমা আরও কেউ কেউ সিদ্ধি খেয়ে একটু মজা করত, অবশ্যই লুকিয়ে । একটু নির্মল আনন্দ :) ।


Sunday, 20 November 2011

আমাদের শহরে বাঙালিদের দুর্গাপুজো হত বাড়ি থেকে বেশ দূরে ,একলা যেতে পারতামনা দাদাদের কেউ না কেউ সারাদিন যাওয়া আসা করত ,কারো সাইকেলের রডে উঠে বসলেই হল । দুর্গাবাড়ী র বারোয়ারী পুজো । সারাদিন বাঙ্গালীদের ভিড়ে জমজমাট ।একচালার প্রতিমা ,খুব বেশি বড়নয় তাই দেখে দেখে আশ মিটতনা । পূজো করতেন মাখন ভট্টাচার্য বৃদ্ধ মানুষ । সন্ধ্যা বেলা আরতি করার সময় মনে হত যেন কিছু তে ভর করেছে । নেশা গ্রস্তর মত নেচে নেচে বহুক্ষন ধরে করতেন আরতি । পাকামন্দির দুর্গাবাড়ির ।সামনে খোলা মাঠে ত্রিপল টাঙ্গিয়ে ,স্টেজ বেঁধে রোজ সন্ধ্যেবেলা নানান অনুষ্ঠান হত। আমার দাদাদের ক্লাব একদিন নাটক করত ।দাদা পিসিমার থান ,জ্যাঠাইমার সেমিজ , বউদিদের শাড়ি নিয়ে যেত পরে নাটক করবে বলে ,একবার বড় বউদির নতুন ব্যঙ্গালোর শাড়ি হারিয়ে এল ,খুব বকুনি খেল বাড়িতে । গঙ্গার ধারে অনেকদিনের পুরনো শিবমন্দির , বুঢ়ানাথ এর মন্দির, বিশাল বড় চত্বর। মাএরা সেখানে নবমীর দিনগঙ্গা স্নান করতে যেত । আমরা ছোটরা পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম । আমাদের মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিত মা। কালীপূজোর আগের দিন ভূতচতুর্দশী ,সেদিন চোদ্দশাক খেতে হয় আর বাড়ির নানা জায়গায় ,বিশেষ করে অন্ধকার জায়গায় প্রদীপ জ্বালাতে হয় সবশুদ্ধ চোদ্দটা প্রদীপ দেওয়ার কথা ,আমাদের অতবড় পুরনো বাড়িতে অনেক অন্ধকার জায়গা তাই প্রদীপের হিসেব ঠিক থাকতনা । পরদিন কালীপূজো। সকাল বেলায় আগের বছর ধুয়ে মুছে তুলে রাখা ঝুড়ি ভর্তি মাটীর প্রদীপ নামানো হত । তার কদিন আগে থেকে যে যখন সময় পেত পুরনো ছেঁড়া ধুতি দিয়ে সলতে পাকাতে বসে যেত। পূজোরদিন দুপুর থেকেই প্রদীপের ঝুড়ি, গোছা গোছা সলতে আর তেলের টিন নিয়ে প্রদীপ সাজানো হত। সন্ধ্যেবেলা থালার ওপরে প্রদীপ বসিয়ে বাড়ি সাজাতাম আমরা ,হাওয়ায় বার বার প্রদীপ নিভে যেত । এছাড়া সেদিন বাড়িতে মহালক্ষ্মীর পূজোও হত । গোবর দিয়ে তৈরী অলক্ষ্মীকে কুলোর হাওয়া দিয়ে বিদায় করে চাল বাটা দিয়ে তৈরী করা কুবের আর লক্ষ্মী নারায়ণ কে বরণ করে বাড়িতে নিয়ে আসা হত । রাত্তির বেলা খাওয়া দাওয়ার পর আমাদের এক দাদা চেম্বার বন্ধ হলে ছোটদের নিয়ে বাজারে আলো দেখাতে বেরত । চোখ বুজলেই দেখতে পাই আমরা দশ /বারটি চ্যাঙা ব্যাঙা চলেছি কলবল করতে করতে। আর অনেক আগে আগে আমাদের দাদা হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে ,রাস্তা ফাঁকা , চারিদিকে প্রদীপ ,মোমবাতি জ্বলছে । আমরা খুব দোল খেলতাম ,কোন বারন ছিলনা ,বড়রাও খেলত নিজেদের দলে । সকালে রঙ খেলা । সব রকম রঙ খেলতাম ,কয়েকটা পেতলের পিচকারি ছিল বাড়িতে ,দোলের আগে সেগুলর ভেতরের পুরনো কাপড় ফেলে দিয়ে নতুন করে কাপড় প্যাঁচাতাম । বিকেলে আবির খেলা সমবয়সীদের সঙ্গে , বড়দের পায়ে আবির দিয়ে প্রনাম করা। আমাদের এক জ্যাঠতুত দিদি থাকতো আমাদের বাড়ী থেকে খানিক দূরে । ,আমারা ছোড়দি বলতাম । ,বয়সে আমার মায়ের থেকে অনেকটাই বড়। তার ছেলেমেয়েরা আমাদের সমবয়সী বা কিছু বড় । ফুল ফলের খুব সুন্দর বাগান ছিল বাড়িতে । , আমদের বাড়ি রঙ খেলার পর আমরা ছোড়দির বাড়ী যেতাম রঙ খেলতে ,ওখানে উঠোন ছিল মাটীর ভেজা উঠোনে পিছলে ধুপ ধাপ পড়তাম । তারপর ওখানেই স্নান এবং মাংস ভাত খাওয়া । এই নিয়ম ছিল সব সময় । খুব ঘসে ঘসে রঙ তুলতাম । বাঁদুরে রঙ উঠতে চাইতনা । সেজন্যে মাঝে মাঝে স্কুলে বকুনি খেয়েছি । ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~



বাড়িতে বাসন মাজতে ,ঘর মুছতে আসত কালিদাই। গায়ের রঙ খুব কালো ছিল বলে মনে হয় সবাই ওকে ওই নামে  ডাকতো মাঝ বয়সী ,রোগা চেহারা ,সামনে আঁচল করে শাড়ী পরা, গলায় মোটা রুপোর হাঁসুলি ,গলায়, হাতে, পায়ে এমন কি কপালেও উল্কি করা ,দু কানের লতি মাঝখান থেকে কাটা মনে হয় ভারি গয়না পরার ফল অনেক পুরন লোক হওয়াতে খুব দাপট ছিল ,কথায় কথায় আমাদের ভয় দেখাত পিসিমাকে নালিশ করবে
                               আসতো রাজিয়া ,কালিদাইয়ের মেয়ে খুব  শক্তপোক্ত  চেহারা আমাদের বাড়ির চাল, গম ঝাড়ত বাছত একটা  যাঁতা বসান ছিল একটা ঘরে সেটাতে ছোলার ছাতু, যবের ছাতু পিষত ,উদুখলে কিসব কুটত রাজিয়ার ছেলে গন্নি আমাদের বাড়ির আর  ডিস্পেন্সারির ফাই ফরমাস খাটত পরে অবশ্য কোন অন্য চাকরিতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল                        
                                                                               রান্নার ঠাকুর আসতো ,ওর আটামাখা দেখার মত ছিল বিরাট বড় কাঁসিতে ঢিপি করে আটানিয়ে দুহাতে দুমদাম করে কুস্তি করার মত করে  ঠাসত দুপুরে সবার খাওয়া হয়ে গেলে একদম আলাদা খেতে বসত আমরা কেউ কাছে গেলে বকত ,আমরা ছুঁয়ে দিলে ওর খাওয়া নষ্ট হবে কারণ আমরা   ব্রমহন  নই আবার সেই ঠাকুরই রাত্তির বেলা আমি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইলে আমার ভাত মন্দিরের মত করে চূড়া করে তাতে আলু পটল ভাজা সাজিয়ে  বলত মন্দির বানিয়ে দিয়েছি ,খেয়ে নাও।                                                             
                                                             আসতো ছুটকী গয়লানি রোদে পোড়া কালো রঙ রুক্ষ চুল,মুখে অজস্র আঁকিবুকি ,মিলের আধময়লা সাদা শাড়ি ,হাতে, গলায় ,পায়ে ভারি ভারি রূপোর গয়না   আর উল্কি দু পায়ের পাতার সামনে দুটো ভেতর দিকে বাঁকানো বাইরের কলে  ধুলো মাখা পা ধুয়ে পিসিমার কাছে গিয়ে বসতো মাথার  নিচু কানার ঝুড়ি নামাত ,অনেক গুলো দুধের কেঁড়ে   সেটাতে ,পিসিমা সিংহাসন বসে হাঁটুর ওপরে কেঁড়ে বসিয়ে নিজের হাতে দুধ মেপে নিত    
                    বিকেলের দিকে আসতো কারুয়ার মা ,নাপতিনী   ছোটখাট ,ফোকলা মুখে হাসি  ভরা

হাতের পুঁটলিতে ঝামা, নরুন,আলতার পাতা, ছোট পেতলের বাটি। বড়োরা বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসত উঠোনে বসে ঝামা দিয়ে পা ঘষে ,নখ কেটে আলতা পরিয়ে দিত আমাদের শুধু নখ কেটে দিত ,মিশনারি স্কুলে পড়তাম কড়া ডিসিপ্লিন আলতা পরা নেল পলিশলাগান একদম বারন। লম্বা ছুটিতে আলতা পরতাম কারুয়ার মা পায়ের পাতায় নানান ডিজাইন করে মনের সুখে আলতা পরাত
                                                                                 একজন গুড়  ওয়ালা আসতো বাঁকে গুড়ের টিন ঝুলিয়ে বড় টিকি ছিল মাথায় ,আমরা ওকে দেখলে বলতাম " টিক্কি মে রাধাকিষান "' অমনি বলত" নেহি নেহি সিতারাম বোল " রাধাকিষান এর বদলে সিতারাম বলতে হবে কেন বুঝতামনা ,বলতামওনা

              আমদের বুড়ো পুরুতমশাই  মারা গেলেন , ওঁর ছেলে দুর্গাচরণ আসতো পুজো করতে ,একটু পাগলাটে ,খেতে খুব ভালোবাসত ,পুজো করতে পারতনা  ঠিক করে  বকুনি খেয়ে খেয়ে পুজো করত। পুজো করা হয়ে গেলে ছোটোকাকিমা যত্ন করে খাওয়াত
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
    

Saturday, 19 November 2011

ছোটবেলা বিহারের মফস্বল সহরে জন্ম আর বেড়ে ওঠা । বাড়িতে অনেক ঘর, বারান্দা,উঠোন,ছাদ অনেক লোকজন, পুরণ জীর্ণদশাগ্রস্থ অনেক প্রবাসী, ভারতবর্ষ, শনিবারের চিঠি আর কিছু অচল পত্র ,সচিত্র ভারত আর ছোটদের পত্রিকা শিশুসাথি । এই বইগুলো দিয়েই আমার ১০/১১ বছর বয়সে গল্প বই পড়ার শুরু । এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে ছিল কিছু জন্তু জানোয়ার ,একটা কালিন্দী নামের ভাল্লুক, চিলিম্পা নামের বাঁদরী আর একটা শেয়াল ,তার নাম মনে নেই।সে থাকতো রান্নাঘরের সামনে উঠোনে একটা বিশাল উনুনের গর্তে ,উনুনটায় মনেহয় বছরে একবার আগুন পড়তো ,একটা বিশাল বড় হাঁড়িতে জল ফুটত তার ওপর । সামনের চোঙদিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে জমত অন্যপাত্রে , distilled water হত বাড়ীতেই বাড়ীতে বেশকিছু ডাক্তার আর দুটো ডাক্তারখানার চাহিদা মেটাতে । শেয়ালটা উঠোনেই থাকত , বাড়ীর অন্য কোথাও যেতনা ,মাঝে মাঝে রাতের দিকে গর্ত থেকে বেরিয়ে আকশের দিকে মুখ তুলে হুক্কাহুয়া করে ডাকতো । কখন যদি আমাদের পোষা কুকর উঠোনে গিয়ে পড়লে দুজনে সাঙ্ঘাতিক ঝটাপটি বেঁধে যেত ,সে সময় ওদের আলাদা করা খুব শক্ত ব্যপার ছিল । আর একটা দৃশ্য মনে পড়ছে , আমাদের এক জ্যঠতুত দাদা গলায় একটা সাপ ঝুলিয়ে ঠাকুর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে , নিশ্চয়ই বিষ দাঁত ভাঙা কোন সাপ । আর ঠাকুর ঘরের নিরাপদ অন্দর থেকে আমাদের এক নির্বিরোধী , ভালোমানুষ , হাসিখুশী জামাইবাবু ভয়ার্ত গলায় নানা রকম সম্ভব অসম্ভব দিব্যি করে চলেছেন , তার সবগুলো এখানে লেখা যাবেনা । দুএকটা নমুনা – “আমি তোর কেনা হয়ে থাকবো , তুই যা বলবি তাই করবো , তোর চাকর হয়ে তোর জুতো পালিশ করে দেবো ইত্যাদি । তুই ওটাকে এখান থেকে নিয়ে যা ভাই ।” দাদা দাঁড়িয়ে নির্বিকার । এটা আমার শোনা কথা দেখা নয় । আমাদের সবচেয়ে ডাকাবুকো জ্যাঠামশাই কি উদ্দেশ্যে কিজানি একটা মাটীর হাঁড়ীর ভেতরে কাঁকড়া বিছে জমা করছিলেন । এক দুপুরে আমাদের ঠাকুমা সেই বিপজ্জনক মাটীর হাঁড়ী নিভন্ত উনুনে বসিয়ে তাদের ভবলীলা সাঙ্গ করান । লম্বা কাচের বাক্সে . chemical e ডোবান ছোট মাপের ঘড়িয়াল দেখেছি । যখন জ্যান্ত ছিল বাইরের উঠোনে বড় চৌবাচ্চায় থাকতো বলে শুনেছি । ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~ । ।


Thursday, 17 November 2011

আমাদের কলাকেন্দ্র । ......... কলাকেন্দ্র আমাদের নাচশেখার স্কুল ।আমাদের আনান্দনিকেতন । সাধারন টালির চালে ছাওয়া সেই স্কুলের সামনে খানিকটা খোলা জায়গায় একটা বড়ো গাছের নিচে সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বেদী করা ,গেরুয়া রঙের দেওয়ালে সুজাতা আর বুদ্ধদেবের fresco আমাদের ড্রইং মাস্টারমশাই অমলদার করা।বাঁশের কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা আমদের কলাকেন্দ্র । যেন একটা আশ্রম । ভেতরে তিন চারটে ঘর .সবচেয়ে বড়ো ঘরটা নাচের ক্লাস । প্রিন্সিপ্যাল বঙ্কিম দা। শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করে আসা আরেকজন ছবি আঁকার মাস্টারমশাই ।আমাদের বাড়িতে বিয়ের সময় মাঝে মাঝে আল্‌পনা দিয়ে দিয়েছেন । অপূর্ব সেই আল্‌পনা । নাচ শিখতাম মণিপুর থেকে আসা দেবেন্দ্র সিংএর কাছে । খুব স্নেহ করতেন আমায় , বাড়িরনামের সঙ্গে একটা বাবু যোগ করে ডাকতেন । ছিলেন ক্লাসিকাল গানের রামপ্রসাদ জি ,মুখে সবসময় পান। ,দরাজ গলায় গান গাইতেন ,মজার মজার কথাও বলতেন । ,ছিলেন সেতারের কপিলদা । খুব মিষ্টি হাত ছিল সুন্দর দেখতে ছিলেন আর ছিলেন জয়ন্তী দি বাটিক আর ছুঁচের কাজের জন্য ।,শান্তিনিকেতন থেকে আসা সাদামাটা দেখতে । উড়িষ্যার লোক । শান্ত ছিলেন খুব । কপিলদা একদম উল্টো । অনেক কথা বলেতেন । সেই জয়ন্তীদি আর কপিলদার প্রেম হল । বেশ গোলমাল হল শহরে । কপিলদারা গোঁড়া মৈথিলী ব্রাহ্মণ । আমাদের বাড়ী ওদের রাখা হল নিরাপদে থাকবে বলে। , আমাদের বাড়ীর ডানপিঠে ,ডাকাবুকো ছেলেদের কেউ ঘাঁটাতনা বড়ো একটা ।তারপর আস্তে আস্তে মিটেও গেল গোলমাল। ,সরস্বতী পুজো হত খুব যত্ন করে একবার মনে আছে পুজোর পর অল্প ফল আর বোঁদে পড়ে আছে আর তখনও অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রসাদের জন্যে ,গোবিন্দ দা বলে একজন আমার আর আমার এক বন্ধু র হাতে প্রসাদের থালা ধরিয়ে দিয়ে বললেন “ শুন , মিঠিমিঠি হঁসনা থোঢ়ি থোঢ়ি দেনা ।"সেই মতই কাজ হল । পুজো হয়ে যাওয়ার পর ভোগের খিচুড়ি খেয়ে আমরা ঠাকুর দেখতে বেরতাম । কনকনে শীত পড়া শহরে শীত যাই যাই করেও যায়নি তখনও ।আমাদের সেই শুকনো হাওয়া বয়ে যাওয়া শহরের রাস্তা । কোথাও এতো চড়াই যে উল্টো দিক থেকে কেউ এলে , একটু একটু করে দেখতে পাওয়া যায় । কোথাও একদম ঢালু । অনেক দূর পর্যন্ত যেতাম হাঁটতে হাঁটতে । সঙ্গে বড় একজন কেউ থাকতেন । ঠাকুর আর কটা হত ! বেড়ানটাই আসল উদ্যেশ্য । বাড়ী থেকে এ সুযোগ পাওয়া যেতনা । একবার গেলাম নৌ লাক্ষা কোঠি দেখতে । বাড়ীটা করতে নাকি ন’লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল । সেই সময় অনেক টাকা । অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়ী ।কেউ থাকেনা , লোকে বলে ভুতের বাড়ী ।নির্জন দুপুরে ফাঁকা জায়গায় ঐ বিশাল বাড়ী দেখে সত্যি গা ছমছম করেছিল সেদিন । । মাঝে মাঝে ফাংশান হতো । বন্ধু রীতা অগ্রবালের কৃষ্ণের একটা solo performance থাকতো । খুব সুন্দর করতো ও । মনিপুরি কৃষ্ণের পোশাক আর তার সঙ্গে ময়ূর পাখা লাগান ভারী মুকুট। প্রত্যেক বার মাথাব্যথা করতো ঐ মুকুট পরার জন্যে , কিন্তু কিছুতেই অষুধ খেতে চাইতনা ,ওরা নেচারোপ্যথী করে , এলোপ্যাথী করবেনা । অমলদা ধমক দিয়ে খাওয়াতেন । যে কোন অনুষ্ঠানে আমাদের সাজাতেন অমল দা । একবার মনে আছে কারো ওপরে খুব রেগে ছিলেন ওই অবস্থায় এসেছেন আমাকে সাজাতে হাতে রঙ নিয়ে এত জোরে থাবড়ালেন যে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে, তখন এক ধমক আমায়" কাঁদছিস যে রঙ ধুয়েযাবেনা ?"বছরে একবার ২৬শে জানুয়ারী সারা বিহার নাচের প্রতিযোগিতা হত পাটনায়। রিহার্সালের জন্যে সময় বেশী পাওয়া যেতনা । তখন এনুয়্যাল পরীক্ষা ডিসেম্বারে হত । শেষের দিকে সেলাই , ড্রয়িং , মাটীর কাজ এই সমস্ত । পড়াশোনার পরীক্ষা শেষ হলেই আমরা রিহার্সাল সুরু করতাম । সকাল আটটা থেকে সুরু হত । কলাকেন্দ্র থেকে স্কুল বেশী দূর ছিলনা ।সকালে রিহার্সালের পর স্কুলে চলে আসতাম । বাড়ী থেকে খাবার পাঠিয়ে দিত , স্কুলে খেয়ে নিতাম । স্কুল থেকে আবার কলাকেন্দ্র । পাটনা যাওয়ার সময় ট্রেনে খুব মজা হত নাচের ক্লাশের বন্ধুরা অনেকেই স্কুলেরও বন্ধু ।সারা রাত জেগে বকবক করতে করতে যাওয়া । বড়দের বকুনি মাঝে মাঝে ঘুমনোর জন্যে । পাটনা পৌঁছে আমরা বঙ্কিমদার বন্ধু মহারথী জির কোয়ার্টারে উঠতাম , । দুটো ঘর দিতেন ওঁরা আমাদের। একটা ছেলেদের অন্যটা মেয়েদের জন্যে । দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বেরিয়ে যাওয়া হত অনুষ্ঠানের জন্য ,রাতে ফেরার সময় বাইরে থেকে খাওয়া দাওয়া করে এসে ঘুম,পরদিন সকালের ট্রেনে বাড়ী। এর মধ্যে একটাই দুঃখ,লম্বা হওয়ার জন্য আমার কোন দিন মেয়ে সাজা হয়নি ।


Sunday, 13 November 2011


                     অনেক রকম অদ্ভুত ......
                           
       বাড়ীতে  কিছু কিছু  অদ্ভুত  জিনিস  দেখে  দেখে  বড়  হয়েছিলাম ।সেগুলো দেখে   কখনই   কোন ভাবান্তর  হয়েছে  বলে  মনে  পড়েনা ।  যেমন  অনেক দিন ধরে  কোন  পুরন আসবাব  এক জায়গায়  থাকলে  সেটা নিয়ে আমরা  মাথা  ঘামাইনা,  সেইরকম । 
                                    আমাদের দোতলার কলঘরের জানলায় একটা মানুষের মাথার  আস্ত খুলি   ওপরের চোয়ালের  দাঁত সমেতরাখা ছিল অনেকদিন পর্যন্ত ,ওটা আমার এক জ্যাঠামশাইয়ের সংগ্রহ  কাউকে   ভয় দেখনর জন্যে , ওটার চোখে   ব্যাটারি দিয়ে আলো লাগান হয়েছিল শুনেছি আমাদের কোন রকম বিকার ছিলনা ,দিব্যি যাওয়া আসা করতাম। আমাদের ডিসপেনসারি আর বাড়ির মাঝখানে একটা দরজা ছিল ওটা খোলাই থাকতো সবসময় ডিসপেনসারিতে ঢুকেই একটা  শোকেশের ওপরে একটা  বড় কাচের জারের মধ্যে একটা অপুষ্ট ,অপরিণত মানব ভ্রূণ chemical e ডোবান আমরা দুপুরবেলা, বিশ্রামের  জন্য বাড়ির সবাই ওপরে চলে গেলে ফাঁকা ডিসপেনসারি তে ঢুকে হলদে টিনের   কৌটো থেকে  glucose খেতাম ,কিছু মনেই হতনা একটু ঘাড় বেঁকিয়ে বসে থাকতো
                                                               আমরা এর মধ্যেই বড় হয়েছি ,আমার মার  কিন্তুঅনেকদিন মামারবাড়িতে কাটিয়ে বাড়ি ফিরতে  খুব খারাপ লাগত   মা বলত   জন্তু জানয়ার এর গন্ধে  মার অসুবিধে হত ।বাড়িতে ঢূকেই বাইরের উঠনে পায়রাদের ঘর কাঠের কাঠামোয় জাল দিয়ে ঘেরা বেশ বড় ঘর একটা ,ওটা ছিল আমাদের সব চাইতে বড় জ্যাঠামশাএর সম্পত্তি ,অনেক রকম পায়রা ছিল ,আমাদের শোবার
ঘরের পেছনের বারান্দা ছিল  ওই উঠোনের দিকে, মাঝে  মাঝে জ্যাঠামনি আমাদের ঘরের দিকে মুখ তুলে আমদের দুই বোনের নাম ধরে ডাকতেন আর আমরা দুড়দাড় করে নেমে আসতাম , পায়রার ডিম সেদ্ধ খেতে। পায়রার  ডিম সেদ্ধ হলে আমরা  খেতাম আর পায়রার খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হত ,ওদের পুষ্টি হবে  বলে । পায়রার  ডিম খেতে মুরগীর  ডিমের মতই , দেখতে একটু অন্যরকম  সাদা  অংশটা  স্বচ্ছ                                                                                       

                                                                         

ভুতের ভয় ছোটবেলায় খুব ভূতের ভয় পেতাম । আমাদের বড় পুরনো বাড়ীতে অনেক অন্ধকার ,আধো অন্ধকার জায়গা ছিল। সেই সব জায়গা গুলো সন্ধ্যের পর ভীষণ হয়ে উঠত । সবচাইতে ভয়ের সময় ছিল রাত্তির বেলা খাবার পর ওপরে শুতে যাওয়া । বাড়ীর লোকেরা তখন সবাই নীচে ব্যস্ত খাওয়া দাওয়া নিয়ে । যারা পড়াশোনা করে তারা হয়ত যারযার ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়ছে ,সামনে পরীক্ষা । নীচের একটা লম্বা আধোঅন্ধকার প্যসেজ পেরিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি , মাঝামাঝি কুলিঙ্গিতে একটা লণ্ঠন জ্বলত । ইলেকট্রিক লাইট ছিল না সিঁড়িতে জানিনা কেন । সিঁড়ির শেষে বাঁদিকে সেজজ্যাঠাইমার এলাকা । একটা বড় একটা বড় একটা ছোট ঘর , একটা বারান্দা আর একটা মোটামুটি বড় ছাদ নিয়ে । খালি পড়ে থাকা । সেজজ্যাঠাইমারা তখন রাস্তার উল্টোদিকে বাড়ি করে চলে গেছে । ঘরের দরজা জানলা সব খোলা । জানলার রঙিন শার্সিতে আলো পড়েছে । নীচে সিঁড়ির মুখে কেউ দাঁড়াত বেশীর ভাগই ছোট কাকীমা । বলত "ওপরে পৌঁছে সাড়া দিবি ,ততক্ষন যাবনা ।" প্রায় চোখ বন্ধ করে দৌড় দিতাম , যতদূর সম্ভব দৌড়ে গিয়ে আর্তনাদের মত করে চিৎকার দিতাম " যা...............ও ওও।" ঘরে পৌঁছেগেলে ভয় অনেকটা কেটে যেত । আমাদের শোবার ঘরের সামনে একটা ছোট ছাদ তার একপাশ দিয়ে তিনতলায় যাবার সিঁড়ি । তিনতলায় বেশীটাই ছাদ আর গোটা তিনেক ঘর ঘরের সঙ্গে বারান্দা । ছাদের ওপর এসে পড়েছে প্রতিবেশীর কাঁঠাল গাছের পাতাসুদ্ধ ডালপালা ।সেই কাঁঠাল গাছ থেকে নাকি মাঝে মাঝে লালপাড় শাড়ী পরা কাউকে ছাদে নেমে আসতে দেখেছে কেউ । একদিন সন্ধ্যের মুখে ছাদে বেড়াতে বেড়াতে কিছু একটা দেখে দাঁতে দাঁত লেগে গেল আমাদের এক আত্মীয়ার । সে এক কাণ্ড জলরে ,পাখারে ,চামচরে ! তবে আমি কিছু দেখিনি কখনও । ছাদের একটা ছোট ঘর সবসময় তালা বন্ধ করা থাকতো ,কোনোদিনও খোলা হতনা । খুব কৌতুহল ছিল আমাদের ,মাঝে মাঝে খড়খড়ি তুলে দেখতাম ভেতরে পুরন আসবাব ভর্তি , তার মধ্যে একটা তেপায়া টেবিল । বাবাদের প্ল্যানচেট করার টেবিল । একসময় বাবারা খুব মেতেছিল প্ল্যানচেট নিয়ে ।শুনেছি একবার নাকি একটা বড় একটা বিপদ হতে যাচ্ছিল ,তারপর আমাদের ঠাকুমা তেপায়া টেবিল ঘরে বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দেয় । আমাদের ডিস্পেন্সারির বাইরের দিকে খানিকটা যায়গায় ব্যবস্থা ছিল রোগীদের থাকার । খানিকটা ঘেরা জায়গা আর জলকল ইত্যাদি নিয়ে । মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে মৃতপ্রায় রোগীকে গরুর গাড়ীতে চাপিয়ে নিয়ে আসতো আত্মীয়রা । বেশীর ভাগই কলেরার সময় । একটা দুটো মরতই প্রতি বছর । যখন খালি থাকতো তখনও আমরা শুনতে পেতাম রাতের দিকে , লোহার জলের বালতি যা ওদের ব্যবহার করার জন্য থাকতো্, যেন নাড়াচাড়া করছে কেউ । এর ব্যখ্যা আমার জানানেই । আরও একটা ঘটনা ঘটতো , তিন তলার বন্ধঘরের নীচের ঘরে থাকলে শোনা যেত অবিকল কেউ যেন গুলি খেলছে , গড়িয়ে দিচ্ছে গুলি । কেউ কেউ অবশ্য বলেছিল --- বন্ধ ঘরে হাওয়ার কারসাজি এটা । হতেওপারে আমাদের কিন্তু অন্যরকম ভাবতেই ভালো লাগত। আমার জ্যাঠতুত দিদি ছোড়দির একটা খুব সুন্দর বাগান ঘেরা বাড়ী ছিল । আমাদের মায়ের চেয়ে বয়সে বেশ বড় ছোড়দির বাড়িতে সকলের জন্যে দরজা খোলা সবসময় । অনেককটি ছেলেমেয়ে , কেউ সমবয়সী ,কেউ বড় । ওইখানে বড় দাদারা প্ল্যানচেট করত। আমারা ঘরের বাইরে থেকে বুঝতে চেষ্টা করতাম ,ভেতরে কি হচ্ছে । ওরা নাকি শরতচন্দ্র কে ডাকতো । শরতচন্দ্রের বদলে আসতেন শ্রীকান্ত ! একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ,উনি কোথায় থাকেন ? উত্তর দিয়েছেলেন --"তোমাদের আতাগাছে " আতাগাছ টাকে এড়াবার উপায় নেই ,ওটার তলাদিয়ে যাওয়াআসা করতেই হবে । তাই সবার হাতেহাতে চাবি ধরিয়ে দেওয়া হল । লোহা থাকলে ভূত কোন ক্ষতি করতে পারেনা তাই ।


চা পর্ব আমাদের পরিবারের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় আমাদের ১১ বছরে বিয়ে হয়ে ১৩ বছরে বিধবা হওয়া ,বাবাদের ছ'ভাই চম্পার একমাত্র পারুল দিদি আমাদের পিসিমার কথা । মোটাসোটা ,মাথায় কাঁচাপাকা চুলের ছোট খোঁপা, সাদা থান পরা , সমদর্শী ,স্থিথধী এমন এক ব্যক্তিত্ব যে তার গুন দিয়ে ছোট থেকে বড় সবাইকে বশীভূত করে রেখেছিল । ভাইদের সংসারের কেন্দ্রবিন্দু । পিসিমাকে ভয় পেতনা কেউ সমীহ করত সকলে । ভাইদের সংসার আগলে রেখেছিল দুহাতে করে । একটা লোহার মোটা পাতের বেশ বড়সড় চৌক টুলের মত ছিল , সেটাকে আমরা সিংহাসন বলতাম , সেখানে বসে পিসিমা সংসার পরিচালনা করত, হাঁটুর ওপরে গয়লানির আনা দুধের কেঁড়ে বসিয়ে নিজের হাতে দুধ মেপে নিত ,নিরামিষ উনুনে দুধ জ্বাল দিত , নানা রকম মিষ্টি বানাত । খই ভাজত । আমাদের খাওয়া দাওয়ার তদারক করত । সকালে একটা মাঝারি হাঁড়ীতে চায়ের জল বসত আর একটায় চা ছাঁকা হত , গুঁড়ো পাতা দিয়ে তৈরি সেই চা করত আমাদের ছোটকাকা , কুস্তিকরা শরীর ,বলিষ্ঠ চেহারার আমাদের ছোটকাকা মাটীতে বাবু হয়ে বসে চা করছে এখনো যেন দেখতে পাই । আমাদের বড়সড় রান্নাঘরে সবাই জমা হত ,যারযার পদ অনুযায়ী কাপ ,কাপপ্লেট ,কাচের গ্লাস,কাজের লোকেরা তাদের কাঁসার পাত্রে চা পেত । পিসিমা চা খেতনা ,একটু দূরে বসত, ওখানে বসত আমাদের জ্যঠামনিও স্পেশাল কাপ প্লেটে চা নিয়ে । সেই সময়টা যেন ছিল পিঠোপিঠি ভাই বোনের অন্তরঙ্গ আলাপের সময় । জ্যাঠামনি হয়ত জানতে চাইল রাতে ঘুম ঠিক হয়েছিল কিনা । পিসিমা বলল ,মশারিতে মশা ধুকেছিল , ঘুমতে অসুবিধে হয়েছে । জ্যাঠামনি ব্যস্ত হয়ে উঠত । এই রকম সাধারন উঠল । আরেকবার চা হত বেলা ১০ টা নাগাদ সেটা করত আমাদের ছোটকাকীমা । ভাল সুগন্ধি পাতা দিয়ে করা সেই চা হত শুধু বাড়ির লোকের জন্যে । সেই সময় যারা সকালে নিজেদের কাজে গেছে পারলে বাড়ি ফিরত । চেম্বার থেকে কিছুক্ষনের জন্যে বাড়ি আসতো । চায়ের সময় একটা পারিবারিক আড্ডাও বসতো । আমাদের ডাক্তার মেজজ্যাঠাবাবু কথা বার্তা বিশেষ বলতনা , বই পত্র নিয়েই থাকতো কিন্তু এই সময় ঠিক আসতো । হাসিঠাট্টা খুব চলত । সম্মান রেখে । সব বয়সের সব আমাদের পরিবারের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় আমাদের ১১ বছরে বিয়ে হয়ে ১৩ বছরে বিধবা হওয়া ,বাবাদের ছ'ভাই চম্পার একমাত্র পারুল দিদি আমাদের পিসিমার কথা । মোটাসোটা ,মাথায় কাঁচাপাকা চুলের ছোট খোঁপা, সাদা থান পরা , সমদর্শী ,স্থিথধী এমন এক ব্যক্তিত্ব যে তার গুন দিয়ে ছোট থেকে বড় সবাইকে বশীভূত করে রেখেছিল । ভাইদের সংসারের কেন্দ্রবিন্দু । পিসিমাকে ভয় পেতনা কেউ সমীহ করত সকলে । ভাইদের সংসার আগলে রেখেছিল দুহাতে করে । একটা লোহার মোটা পাতের বেশ বড়সড় চৌক টুলের মত ছিল , সেটাকে আমরা সিংহাসন বলতাম , সেখানে বসে পিসিমা সংসার পরিচালনা করত, হাঁটুর ওপরে গয়লানির আনা দুধের কেঁড়ে বসিয়ে নিজের হাতে দুধ মেপে নিত ,নিরামিষ উনুনে দুধ জ্বাল দিত , নানা রকম মিষ্টি বানাত । খই ভাজত । আমাদের খাওয়া দাওয়ার তদারক করত । সকালে একটা মাঝারি হাঁড়ীতে চায়ের জল বসত আর একটায় চা ছাঁকা হত , গুঁড়ো পাতা দিয়ে তৈরি সেই চা করত আমাদের ছোটকাকা , কুস্তিকরা শরীর ,বলিষ্ঠ চেহারার আমাদের ছোটকাকা মাটীতে বাবু হয়ে বসে চা করছে এখনো যেন দেখতে পাই । আমাদের বড়সড় রান্নাঘরে সবাই জমা হত ,যারযার পদ অনুযায়ী কাপ ,কাপপ্লেট ,কাচের গ্লাস,কাজের লোকেরা তাদের কাঁসার পাত্রে চা পেত । পিসিমা চা খেতনা ,একটু দূরে বসত, ওখানে বসত আমাদের জ্যঠামনিও স্পেশাল কাপ প্লেটে চা নিয়ে । সেই সময়টা যেন ছিল পিঠোপিঠি ভাই বোনের অন্তরঙ্গ আলাপের সময় । জ্যাঠামনি হয়ত জানতে চাইল রাতে ঘুম ঠিক হয়েছিল কিনা । পিসিমা বলল ,মশারিতে মশা ধুকেছিল , ঘুমতে অসুবিধে হয়েছে । জ্যাঠামনি ব্যস্ত হয়ে উঠত । এই রকম সাধারন উঠল । আরেকবার চা হত বেলা ১০ টা নাগাদ সেটা করত আমাদের ছোটকাকীমা । ভাল সুগন্ধি পাতা দিয়ে করা সেই চা হত শুধু বাড়ির লোকের জন্যে । সেই সময় যারা সকালে নিজেদের কাজে গেছে পারলে বাড়ি ফিরত । চেম্বার থেকে কিছুক্ষনের জন্যে বাড়ি আসতো । চায়ের সময় একটা পারিবারিক আড্ডাও বসতো । আমাদের ডাক্তার মেজজ্যাঠাবাবু কথা বার্তা বিশেষ বলতনা , বই পত্র নিয়েই থাকতো কিন্তু এই সময় ঠিক আসতো । হাসিঠাট্টা খুব চলত । সম্মান রেখে । সব বয়সের সব সম্পর্কের সবাই থাকতেন তো , তাই । মধুছন্দা পাল । মধুছন্দা পাল ।


Saturday, 12 November 2011

চেপ্টি


                              চেপ্টি ।
ছোটবেলায়  একটা  পুতুল  কোলে   ঘুরতাম ।  কাপড়ের  তৈরী  সেই  পুতুলের  রুটির মত গোল মুখে  চোখ , নাক , ঠোট আঁকা ।  নুলো নুলো  হাত পা । কোমর থেকে  হাঁটুর ওপর পর্যন্ত  শুধু  সামনে দিকে  স্কার্ট  পরানো । বেশ বড়সড় মাপের  পুতুল , কোলে নিতে  বেশ  ভালো লাগত । নাম ছিল  চেপ্টি । দাদার দেওয়া নাম ।পুরোটা চ্যাপ্টা তাই  চেপ্টি ।  অতি যত্নের  ফলে চেপ্টির অন্তিম দশা ঘনাত কিছুদিন  পর পর ।তাছাড়া  দাদা  কালী  দিয়ে  চেপ্টির  দাড়ি  গোঁফ  এঁকে  দিত  আমার  অজান্তে ।  পরিস্কার  করতে  গিয়ে    নীল  মুখের চেপ্টি  হয়ে  যেত ।  আমাদের বিহারের  ছোট শহরে  চেপ্টি  পাওয়া যেতনা  কেউ না কেউ  কলকাতায় যেতই  মাঝে মাঝে,   তখন  নিয়ে  আসত । চেপ্টি পর্ব বেশ কিছুদিন  চলেছিল । এছাড়া  একরকম কাঁচের পুতুল নিয়েও খেলেছি । সাদা রঙ । চোখ আর চুল কালো , ঠোঁটের জায়গায় লাল রঙ , তবে রঙ  ঠোঁট  ছেড়ে  বেরিয়ে যেত মাঝে মাঝেই । একটা হাত বুকের   ওপর  আড়াআড়ি করে  রাখা । অন্যটা ঠোঁটের ওপর । নানান মাপের হত  এগুলো ।  এদের বর ,বউ সাজিয়ে  বিয়ে  দিতাম । আমাদের  বাড়ীর  বড়রাও কেউ কেউ তাতে অংশ নিত । একবার মনে আছে বড় বউদি খুব সুন্দর করে পুঁতি দিয়ে  বউএর  গয়না  করে  দিয়েছিল । ছোটকাকীমা  ছাড়া আমরা  আমাদের  এই সব উৎসব কল্পনাও  করতে  পারতামনা । আমার মার বয়সী ছিল ছোটকাকীমার একমাত্র  মেয়ে   রাঙাদি  আমার সব চেয়ে বড় দিদির  চেয়ে একটু বড় । কিন্তু  সমস্ত  কিছুতেই  অদম্য  উৎসাহ  ছোটকাকীমার ।  রবিবার  মর্নিং শোতে মাঝে মাঝে  বাঙলা  সিনেমা  আসতো ।  ছোটোকাকীমা  দলবল  নিয়ে  ,সঙ্গে  আমরাও থাকতাম  চলল  সিনেমা দেখতে ।  আমাদের  ওসকাত “ ফিস্ট করবি ?’   আমরা  ছোটরা  বড়দের থেকে  চাঁদা তুলতাম ।তারপর বাকি কাজ  ছোটকাকীমার । জানিনা  কি করে এত সামলাত । যাই হোক ,পুতুলের বিয়ের  লুচি ,আলুরদম  ,মিষ্টি  আর  ছোট ছোট কাপে চা ।  আহা !
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------