Sunday, 22 April 2012

শান্তিমামা //


     চাঁদমামা  যেমন সকলের মামা ।  আমাদের শান্তিমামাও  তেমনই    আমদের,  আমাদের  ছেলেমেয়ে এবং আরও  অনেকের ।  
                আসলে  শান্তিমামা ছিল  ছোটকাকিমার  ভাই , বৈমাত্র ভাই । অবশ্য বোঝার  কোন  উপায় ছিলনা । শান্তিমামা এবং আরও কয়েকজন  ভাই বোন ছিল ছোটকাকিমার ।কাউকেই নিজের ভাইবোন ছাড়া অন্যকিছু মনে হয়নি কখনও । শান্তিমামাকে  ছোটকাকীমা  বলতো কান্তি’। পিসীমার  ্নাম  শান্তি  , তাই ঐ নাম  ধরে  ডাকবেনা ।   সবাই মাঝে মাঝে আসতো দিদির বাড়ী বেড়াতে ,  দিদিমাও আসতেন
                      কিন্তু এর মধ্যে   সবচেয়ে  প্রিয় ছিল  শান্তিমামা  সকলের। শুধু ছোটকাকীমার  একটু কম ।  ছোট বড়  বুড়ো  নির্বিশেষে । অথচ  দেখে  ভালো লাগার  মতো চেহারা ছিলনা শান্তিমামার । কালো পাকানো চেহারা ।ভাঙা গাল ।    ডান হাতের তর্জনীতে বেশী সিগারেট  খাওয়ার  চিহ্ন তবু  সবাই  পছন্দ করতো  শান্তিমামাকে । 
    প্রথম জীবনে  যুদ্ধে  গিয়েছিল , বার্মায় ।  সেই গল্প বলতো আমাদের    জঙ্গলের  গল্প ,  জলকাদার  মধ্যে দিয়ে পিঠে  ভারী  বোঝা নিয়ে  হাঁটার  গল্প ।  নানান  রকম  বিষাক্ত  পোকা মাকড়ের   গল্প  আর বলতো  ভীষণ  মশার  কথা ।  যে  গল্পই  বলতো  হাঁকরে শুনতাম ।  অথচ  খুব যে  আকর্ষণীয়  করে   রঙ চড়িয়ে  বলতো  তাও নয় ।  কিন্তু ঐ সহজ  করে  বলার মধ্যেই  থাকতো  আসল  টান ।  চেন স্মোকার   ছিল ।মাঝে মাঝে  থেমে  সিগারেটে  টান দিয়ে  কিছুক্ষন  পর ধোঁয়া  ছেড়ে  আবার  শুরু করতো ।


           এক সময় কাঠের  আসবাবের  ঠিকাদারি ,  মেরিন  ইঞ্জিনিয়ারিং  কলেজের  ক্যান্টিনের   ম্যনেজারি ,  ক্যাটারিং ।  এই রকম  অনেক কিছু করেছে ।  কিছুদিন  পর পর   বদলাত পেশা ।  কোন কিছতেই  বেশীদিন  লেগে  থাকতোনা ।  একবারে  বাউন্ডুলে  যাকে বলে ।  যখন  হাতে পয়সা   থাকতো দুহাতে  খরচ  করতো ,  উপহার দিত , ভালো রেস্টোর‍্যান্টে  খাওয়াত  সকলকে ।
       নিজেরও  কিছু সখ  ছিল ।  মদ্যপান  তার মধ্যে একটি ।  আর  পছন্দ  ছিল  সুন্দরী নারী  সঙ্গ ।
 সঙ্গ  মানে সঙ্গই  । যদি  বেশী  কিছুনা  না পাওয়া  যায় তো পাশে  নিয়ে  বেড়িয়ে  এলেই খুশী । সুন্দরী  অবশ্যই  হতে  হবে ।  তবে   বাড়ীতে  বসে  কখনও  পান  করতে দেখিনি  বা  অন্যকোন  দোষেরও  পরিচয়  পাইনি । 
                এ সমস্ত  কথা  জেনেছি  বড়  হয়ে ।        আমদের  ১৩/ ১৪ বছর  বয়সে  যখন জীবনের  সমস্ত  কিছুর স্বাদ  জানতে ইচ্ছে  করে  তখন  সিগারেট    প্রথম  টেস্ট  করেছি   শান্তিমামার  কাছ থেকে  নিয়ে  খালি বলেছে “ কাশি  হবে  কিন্তু । ”   কিন্তু   কখনও  বলেনি খাওয়া  খারাপ ।খাবিনা ।সত্যি করেই  কেশেছি ,  তেঁতো  লেগেছে ।   জানতাম  ধরা  পড়লে  আমাদের  সঙ্গে সঙ্গে  শান্তিমামাও  বকুনি খাবে ।  কিন্তু  আমাদের  বকুনি খাওয়া থেকে  বাঁচাতে চেষ্টা করবে ।
    একটু  অপ্রস্তুত  হাসি হেসে  কিছু  বলতে  চেষ্টা  করবে ।
      বাড়ীর  ওপর কোন টান ছিল বলে মনে হতনা ।  মা একবার  দিদিমাকে  বলেছিল  “ওর  একটা  বিয়ে দিন , তাহলে  ওর  বাউন্ডূলেপনা  যাবে ।”  দিদিমা  বলেছিলেন “ জেনে শুনে একটা মেয়ের  সর্বনাশ  করতে  পারবনা ।    যা ছেলে  বৌ কে  আমার ঘাড়ে  ফেলে  পালাবে। ”বক্তব্য টার  মধ্যে  যুক্তি ছিল।
                    যখন হাত খালি  হয়তো চলে এলো আমাদের বাড়ী  বা  এরকমই কারো বাড়ী ।  কদিন   থাকলো ।  একদিন  হয়তো দেখা  গেলো  আলনায়  রাখা  কারো একটা পাঞ্জাবী বা সার্ট  পরে  বেরিয়ে  গেছে । গেলো তো গেলোই ।  মাস দুই পরে আবার  দেখা দিল ।  পাঞ্জাবীর  কথা  বলে  একটু  বকাবকি  করা  হোল । একটু একটু হেসে কিছু  বলতে  চেষ্টা করলো । ব্যাস , আবার যেকে সেই ।   কিন্তু সে ভাবে  কেউ  রাগ করতেও  পারতোনা ।  সবাই চাইত  এসেছে  যখন   কিছুদিন   থাকুক ।  হয়তো  সকালে  এসেছে  আমাদের  বাড়ী ।  বললাম  থাকো  সারাদিন  বিকেলে  যেও ।  ব্যস্ত না থাকলে  থেকেও যেত ।
    দিদির  শ্বশুরমশাই এর  খুব প্রিয় পাত্র ছিল ।  হয়তো দিদির সঙ্গে দেখা করতে  গেছে  ,দিদির  শ্বশুরবাড়ি  ।বসার ঘরে  দিদির  শ্বশুরমশাই  বসালেন ।  উনি  খুব  বাজার করতে  ভালবাসতেন ।  রোজ সকালে  কাজের ছেলের  হাতে দুটো থলে ভর্তি  করে  বাজার  নিয়ে  ট্রামে   করে  লেকমার্কেট  থেকে       ফিরতেন।
       তো  শান্তিমামা  বসলো আর  উনি   গড়গড়ার  নলে  মাঝে মাঝে  টান দিতে দিতে  বাজার করার গল্প  করে  যেতে লাগলেন   আধঘণ্টা  /পঁয়তাল্লিশ  মিনিট  ধরে  । আজ কি কি মাছ  এনেছেন , কি কি মাছ উঠেছিল , কেমন দাম ্মাছের এই রকম সব । শান্তিমামা  নির্বাক শ্রোতা । উনি  ছাড়লেন  যখন দিদির  সঙ্গে  দেখা করতে গেল ।  তার মধ্যে  চা খাবার খাওয়া  সারা হোল ।
       হয়তো   কোন কাজ  দেওয়া  হয়েছে    বলে গেল  পরশু এসে  খবর দেবে ।  বললাম  “ঠিক আসবে তো ?”  বললো  “ঠিক  আসবো , উইদাউট  ফেল ।”  ব্যাস , এই অপয়া  কথাটা মুখ থেকে  বেরন  মানেই অন্তত  মাসখানেক   দেখা  পাওয়া  যাবেনা ।  
    আমাদের  বাড়ী শেষ  যেবার এলো তখন  আমি গিন্নী  হয়ে গেছি ।  জিজ্ঞেস  করলাম “ কি খাবে  শান্তিমামা ?”  বলেছিল  “ডবল ডিমের  অমলেট  খাব   আগে ডিমে  এর্লাজি  থাকায়  খেতনা  ডিম ।  সেদিন  বল  এর্লাজি  সেরে  গেছে । 
      সারাদিন  বেশ  ভালো কাটল ।  মেরিনকলেজে  কর্তা  যখন  ছাত্র  তখন  শান্তিমামা  ওখানে  চাকরী  করে ।  কাজেই  পরিচয় ছিলই ।  উনি  শান্তিমামার  নাম ধরে ডাকতেন  বয়সে  অনেক বড় হওয়া  স্বত্বেও । এবং  কলেজে  থাকা কালিন  খুব  জ্বালাতনও  নাকি করেতেন ।
          আমাদের খুড়তুত দিদি রাঙাদির  কাছে  শেষ  জীবন  কেটেছিল । আমরা যেতাম মাঝে মাঝে ।  ঐরকমই  ছিল  যেমন  দেখেছিলাম  প্রথমে । 
              যেদিন চলে গেল  গিয়ে দেখলাম  যেন  ঘুমোচ্ছে    কোন  কষ্টের   চিহ্ন  নেই  মুখে ।  রাঙাদি  হাসি কান্না  মেশানো  মুখে  তাকিয়ে  শ্মশান যাত্রীদের  সঙ্গী  হোল ।  বলল “যাই , এগিয়ে দিয়ে আসি ।”

Saturday, 21 April 2012

নকাকা //

আসলে  ন’জ্যাঠাবাবু  বলে   ডাকা  উচিত ছিল  ।আমার বাবার ওপরের  ভাই । ছজন ভাইয়ের মধ্যে   চতুর্থ । কিন্তু যেহেতু  আমরা চার  ভাইবোন আর খুড়তুতো  দিদি  রাঙাদি ছাড়া  জ্যাঠাবাবু  বলার কেউ নেই আর কাকা বলার  জন্যে  তেইশ জন ,   তাই আমরা  চার ভাইবোনও  কাকা বলার দলে ঢুকে পড়ে ছিলাম ।

    ন’কার  ঘর ছিল  তিনতলায়  আমাদের ঘরের  ঠিক ওপরেকিন্তু ঘর  খালি  পড়ে থাকতো ।  দুটি  সন্তানকেই  এবাড়ী তে  থাকতে  হারিয়ে  ন’কা আর ন’কাকীমা এখানে আর  থাকতে পারেনি ।  রাস্তার উল্টোদিকে  সেজজ্যাঠাবাবুর  বাড়ীতে  থাকতে চলে  গিয়েছিল ।

        ন’কা    ওকালতি করতো । আমাদের বাড়ীতে রাস্তার দিকে  মুখ  করা একটা ঘরে  ছিল চেম্বার ।   সন্ধ্যে  বেলা মক্কেলদের  খুব   ভীড়  হতো ।  তার মধ্যে  প্রায়  রোজই আসতেন  ন’কাকার  প্রফেসর  বন্ধু  গোলোক বাবু ।  মাথা ভর্তি পাকাচুল  ।পায়জামা পাঞ্জাবী পরা ।  চেম্বারের  লোকজন একটু  কম থাকলে  ন’কাকা আমাকে   ভেতর থেকে ডেকে পাঠাতো ।  আমি এসেই  বলতাম “গোলোকবাবুচক্‌ ।” তিনটে শব্দ জুড়েই  বলতাম   গোলোক  বাবু পাঞ্জাবীর  পকেট  থেকে  চক্‌  বের করে দিতেন ।

     আমার ওপর  বাড়ীর আরও অনেকের মতই ন’কাকার  একটু বেশী স্নেহ ছিল ।  আমার উনিশ দিনের  ছোট  জ্যাঠতুত  বোন কেয়ার ওপরেও ।আমাদের দুজনের যেন বন্ধু ছিল  ন’কাকা ।  নানা রকম  ঠাট্টা করতো , রাগানোর  চেষ্টা করতো । কানে বেশ কম শুনত ,সেই জন্যে  খুব জোরে জোরে  কথা বলতো । হা হা করে হাসত । শুনতে পাচ্ছি যেন  ন’কাকার হাসি ।   সুন্দর দেখতে ছিল , মাথায়  অনেক চুল ।

     আমাদের  সকাল  দশটার  চায়ের আসরে  ঠিক আসতো ।  আগেই বলেছি  এটা ছিল  আমাদের  পারিবারিক  আড্ডার সময় ।  সম্পর্ক , বয়স  নির্বিশেষে  আড্ডা হতো ।
                 পরে  ন’কাকা  কোর্টএর কাছে ( আমরা অবশ্য বলতাম  কাছারি) , বাড়ী করে চলে গিয়েছিল । আমাদের  বাড়ী  থেকে  অনেকটাই দূর ।  খুব ফাঁকা  লাগতো মনে আছে বাড়ীর নাম রেখেছিল  সূর্যমুখী ।  পুবমুখো  বাড়ী ।

        অনেকখানি  ফাঁকা  জমি  ছিল বাড়ীর   সঙ্গে  , পরে ন’কাকা  ওখানে  খুব সুন্দর  বাগান করেছিল ।  খুব বড় বড়  বেলফুল  ফুটত মনে আছে । আর   মনে আছে  কানাই বাঁশি  কলার কথা ।  বেঁটে বেঁটে  গাছে  এতো লম্বা  কলার কাঁদি  যে প্রায়  মাটিতে  ঠেকে  যেত ।  বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখতে হতো  গাছ ।

কখনও  কখনও ন’কাকা আমাকে  কয়েকদিনের  জন্যে নিয়ে যেত  বাড়ীতে ।  ঠিক উল্টো  দিকে  তিন  বোনের  তিনটি  বাড়ী  ছিল  পর পর ।বাড়ী গুলোর  নাম -  দয়া , মায়া , ক্ষমা । ন ’কাকার  বাড়ীর  পাশে  খানিকটা  পোড়  জমির  পর ছিল  একটা দুতলা  বাড়ী  ইন্দিরাদি , অপর্ণাদিদের বাড়ী ওটা ।  চারজন মেয়ে  আর তাদের বৌদি ,মা, বাবাদাদা  মনে হয় বাইরে কোথাও চাকরী করতেন । মাঝে মাঝে আসতে দেখেছি । দিদিরা  সকলেই আমার  থেকে  বড় কিন্তু  বেশ বন্ধুত্ব  ছিল সকলের  সঙ্গে ।  ন’কাকাকে দাদা আর   ন’ কাকীমা কে বৌদি বলে ডাকতো  ওরা । বাড়ীর  লোকের মতো ছিল ।
  সন্ধ্যেবেলা  ন’কাকার বাড়ীতে  একটা গল্পের আসর বসতো । ন’কাকিমার বোন  ছিল  ফাচু মাসী । কলকাতায়  থাকতো । হাইকোর্টে  প্র্যাক্টিস করতো ।  অসাধারন  গল্প  বলার  ক্ষমতা ছিল। ফাচুমাসী থাকলে তো সোনায়  সোহাগা !
                 একদিন দুপুরে ইন্দিরাদির  সঙ্গে  একটু দুরের একটা  জঙ্গল মতো  জায়গা পার হয়ে  একটা  পকুরের  ধারে পৌঁছেছিলাম , পুকুরে পানিফল  হয়ে আছে  দেখে  দুজনে মিলে  অনেক চেষ্টা   করেছিলাম  ঝাঁকটাকে  টেনে আনার , কিন্তু পারিনি ।

         মাঝে মাঝে ছোটকাকীমা  কিংবা  মার  সঙ্গে  বিকেলের  দিকে  রিক্সা করে  ন’কাকার বাড়ী যেতাম ।  যে রাস্তা  দিয়ে  যেতাম  তার কথা এখনও  ভুলিনি ।    ফাঁকা রাস্তা । আমাদের  ওদিকে  যেমন  হয়  চড়াই  উৎরাই   পার  হয়ে  যাওয়া । চারিদিকে   ঝোপঝাড়  , গাছপালা আর  তার একটা  বুনো  গন্ধ ।   সরকারি  হাসপাতালের  উঁচু  দেওয়াল ।  চারিদিক নির্জন ।  দূরে দূরে  একটা দুটো বাড়ী । পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা । ভেতরে  বাগান ।  ওদিকে  সবই বাঙালীদের  বাড়ী ।  কোনটায়  লোক আছে  কোনটায়  নেই ।  ছোট ছোট সুন্দর নাম ।         

                        কাছারি পার হয়ে  যেতে হত  কখনও  কখনও  কাছারির  সামনের  মাঠ থেকে  ন’কাকা আমাদের  দেখতে পেত ।     আসতে  দেরি থাকলে ছোটবেলা  থেকে  বাড়ীতে থাকা মোহন , যাকে সবাই ডাকতো মোহ্‌না   বলে  তার হাতে   অনেক খাবার দাবার   পাঠিয়ে দিত ।আর তা নাহলে নিজেই নিয়ে আসতো । 

                              যেদিন ন’কাকা বাড়ী থাকতো  দূর থেকে  গলা  শোনা যেত । ন’কাকীমাও ন’কাকার  সঙ্গে থেকে জোরে  কথা বলার  অভ্যেস  হয়ে গিয়েছিল ।

                     কি স্পষ্ট হয়ে এলো ন’কাকার স্মৃতি ।  মাথায় অনেক চুল ।   হাসি হাসি মুখ ।  জোরে   কথা বলা , ঠাকুমার  সব চাইতে  ডানপিটে  ছেলে  আমাদের ন’কাকা ।।

সেজজ্যাঠাবাবু //

         সেজজ্যাঠাবাবু  ছিল মেজজাঠাবাবুর  একেবারে বিপরীত ।  দারুন দাপুটে , প্রভাবশালী , নামকরা ডাক্তার । আশপাশের  শহর এমনকি পাটনা  থেকেও  রোগী আসত  বলে শুনেছি। কংগ্রেস করতো ।শুনেছি  ছেচল্লিশ  সালের দাঙ্গার  সময়  জাতি ধর্ম  নির্বিশেষ  অনেক মানুষকে  রেস্কিউ করে নিরাপদ জায়গায়  রেখেছিল । একটা জীপ ছিল । ওটাতে  করে ঘুরে ঘুরে  চারিদিক  সামাল দিয়ে  বেড়িয়েছিল ।

             আমার অবশ্য যখন থেকে মনে আছে  তখন আর এসব কিছুই করার মতো অবস্থায় ছিলোনা । পক্ষাঘাত হয়েছিল । প্রথম যখন মনে পড়ে  হাতে লাঠি নিয়ে একটু পা টেনে হাঁটতো । তারপর  আস্তে আস্তে সেটাও  আর পারতনা । সমস্ত কিছুর জন্যেই  কারো সাহায্য লাগতো । তবে তখন যে কথা বলতো আমরা সবাই বুঝতে পারতাম যদিও  কিছুটা  জড়িয়ে  গিয়েছিল  কথা ।   আমাকে বলতো  “তোর নাম মৎস্যগন্ধা ,আর কেয়ার নাম মধুছন্দা । কেয়া সেজজ্যাঠাবাবুর  মেয়ে ,আমার  উনিশদিনের ছোট বোন ।   নামটা আমার মোটেই পছন্দ হতোনা ।যদিও  মৎস্যগন্ধার  সত্যবতী  হওয়ার গল্প জানতাম ।আমদের মা আমদের  অসুখ বিসুখ করলেই  হয় মহাভারতের গল্প বলতো নাহলে  চয়নিকা থেকে  কবিতা  পড়ে  শোনাত ।  তবু  নামটা বিচ্ছিরি লাগতো ।  জোরে জোরে  প্রতিবাদ করতাম । সেজজ্যঠাবাবু হাসত ।

           আগেকার দিনের  বিরাট  একটা  ডবল হাতল ওয়ালা  আরামকেদারা  ছিল যেটাতে  আধশোয়া  হয়ে   থাকতো  সেজজ্যাঠাবাবু  প্রায় সারাদিন ।  আরও একটা একদম ঐ রকম ছিল  আমাদের বাড়ীতেও । একটা  টানা রিক্সাছিল এক বুড়ো রিক্সাওয়ালার ।সে  রোজ সেজজ্যাঠাবাবুকে   ওবাড়ী থেকে এবাড়ী নিয়ে আসতো । দুপুর বেলা  খাওয়ার সময় ।  দুপুরের   ভাত  পিসিমার  হাতে খেত । রাতে  সেজজ্যাঠাইমা   খাইয়ে দিত ।  যদিওএকই  রাস্তার এপারে ওপারে  বাড়ী  তবু এছাড়া  আসার বোধহয়  অন্য কোন  উপায়  পাওয়া যায়নি ।  সঙ্গে  কেউ একজন থাকতো ।

      ওবাড়ী  থেকে  ঠাকুর   সেজজ্যাঠাবাবুর  খাবার  এবাড়ীতে  পৌঁছে দিয়ে যেত ।   একটুখানি  সুগন্ধ ওয়ালা আতপ চালের  ভাত , সঙ্গে হালকা  রান্না । পিসিমা  ভাইয়ের বুকের ওপর  সাদা তোয়ালে  পেতে  একটু একটু করে খাইয়ে দিত ।  আমি মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়াতাম । খুব ভালো লাগতো  অমন যত্ন করে খাওয়ান দেখতে । সেজজ্যাঠাইমাও খুব যত্ন  করে  খাওয়াতো । যেন একটা শিশু ।
              সেজজ্যাঠাবাবুর   কথা  পরের দিকে একদম জড়িয়ে  গিয়েছিল ।  আমরা বুঝতে পারতামনা  কি বলছে ।  কেউ কেউ বুঝত । পিসিমা বুঝতে পারত ।  মাঝে মাঝে  কারো ওপর কোন কারণে  অভিমান  হলে  কান্না কাটি করতে দেখেছি পিসিমার কাছে । তার সঙ্গে  কিছু বলতোও ।  পিসিমা ঠিক বুঝত । বোঝাতো ভাইকে । একটা ঘটনা  মনে পড়ে  আমাদের  কাতুদা ডাক্তার মানুষ । একটু বেশীরকম  অন্যমনস্ক ।  কোনদিন  বোধহয়  সেজজ্যাঠাবাবুর  সামনে দিয়ে  সিগারেট খেতে খেতে বেরিয়ে গেছে । কাতুকাকে যারা চেনে  সবাই বুঝবে কাতুদা বাবাকে লক্ষ্যই  করেনি কিন্তু  সেজজ্যাঠাবাবুর মনে হয়েছে ছেলে আর বাবাকে গ্রাহ্য করেনা । পিসিমাকে  সেদিন  ভাইকে  শান্ত  করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল ।

        সেজজ্যাঠাবাবু  রাতের দিকে মারা  গিয়েছিল   খুব ভোরে  ও বাড়ী থেকে  বাড়ী এসে  পিসিমার  সঙ্গে প্রথম দেখা  মুখ থমথমে ।  দেখলেই  বোঝাযায়  ঝড় চলছে ভেতরে   খুব স্বাভাবিক  ভাবে জিজ্ঞেস করলো   “নিয়ে গেছে ?”

      অদ্ভুত বাঁধন ছিল ভাই বোনের মধ্যে ।