Sunday, 13 November 2011

ভুতের ভয় ছোটবেলায় খুব ভূতের ভয় পেতাম । আমাদের বড় পুরনো বাড়ীতে অনেক অন্ধকার ,আধো অন্ধকার জায়গা ছিল। সেই সব জায়গা গুলো সন্ধ্যের পর ভীষণ হয়ে উঠত । সবচাইতে ভয়ের সময় ছিল রাত্তির বেলা খাবার পর ওপরে শুতে যাওয়া । বাড়ীর লোকেরা তখন সবাই নীচে ব্যস্ত খাওয়া দাওয়া নিয়ে । যারা পড়াশোনা করে তারা হয়ত যারযার ঘরে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়ছে ,সামনে পরীক্ষা । নীচের একটা লম্বা আধোঅন্ধকার প্যসেজ পেরিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি , মাঝামাঝি কুলিঙ্গিতে একটা লণ্ঠন জ্বলত । ইলেকট্রিক লাইট ছিল না সিঁড়িতে জানিনা কেন । সিঁড়ির শেষে বাঁদিকে সেজজ্যাঠাইমার এলাকা । একটা বড় একটা বড় একটা ছোট ঘর , একটা বারান্দা আর একটা মোটামুটি বড় ছাদ নিয়ে । খালি পড়ে থাকা । সেজজ্যাঠাইমারা তখন রাস্তার উল্টোদিকে বাড়ি করে চলে গেছে । ঘরের দরজা জানলা সব খোলা । জানলার রঙিন শার্সিতে আলো পড়েছে । নীচে সিঁড়ির মুখে কেউ দাঁড়াত বেশীর ভাগই ছোট কাকীমা । বলত "ওপরে পৌঁছে সাড়া দিবি ,ততক্ষন যাবনা ।" প্রায় চোখ বন্ধ করে দৌড় দিতাম , যতদূর সম্ভব দৌড়ে গিয়ে আর্তনাদের মত করে চিৎকার দিতাম " যা...............ও ওও।" ঘরে পৌঁছেগেলে ভয় অনেকটা কেটে যেত । আমাদের শোবার ঘরের সামনে একটা ছোট ছাদ তার একপাশ দিয়ে তিনতলায় যাবার সিঁড়ি । তিনতলায় বেশীটাই ছাদ আর গোটা তিনেক ঘর ঘরের সঙ্গে বারান্দা । ছাদের ওপর এসে পড়েছে প্রতিবেশীর কাঁঠাল গাছের পাতাসুদ্ধ ডালপালা ।সেই কাঁঠাল গাছ থেকে নাকি মাঝে মাঝে লালপাড় শাড়ী পরা কাউকে ছাদে নেমে আসতে দেখেছে কেউ । একদিন সন্ধ্যের মুখে ছাদে বেড়াতে বেড়াতে কিছু একটা দেখে দাঁতে দাঁত লেগে গেল আমাদের এক আত্মীয়ার । সে এক কাণ্ড জলরে ,পাখারে ,চামচরে ! তবে আমি কিছু দেখিনি কখনও । ছাদের একটা ছোট ঘর সবসময় তালা বন্ধ করা থাকতো ,কোনোদিনও খোলা হতনা । খুব কৌতুহল ছিল আমাদের ,মাঝে মাঝে খড়খড়ি তুলে দেখতাম ভেতরে পুরন আসবাব ভর্তি , তার মধ্যে একটা তেপায়া টেবিল । বাবাদের প্ল্যানচেট করার টেবিল । একসময় বাবারা খুব মেতেছিল প্ল্যানচেট নিয়ে ।শুনেছি একবার নাকি একটা বড় একটা বিপদ হতে যাচ্ছিল ,তারপর আমাদের ঠাকুমা তেপায়া টেবিল ঘরে বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দেয় । আমাদের ডিস্পেন্সারির বাইরের দিকে খানিকটা যায়গায় ব্যবস্থা ছিল রোগীদের থাকার । খানিকটা ঘেরা জায়গা আর জলকল ইত্যাদি নিয়ে । মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে মৃতপ্রায় রোগীকে গরুর গাড়ীতে চাপিয়ে নিয়ে আসতো আত্মীয়রা । বেশীর ভাগই কলেরার সময় । একটা দুটো মরতই প্রতি বছর । যখন খালি থাকতো তখনও আমরা শুনতে পেতাম রাতের দিকে , লোহার জলের বালতি যা ওদের ব্যবহার করার জন্য থাকতো্, যেন নাড়াচাড়া করছে কেউ । এর ব্যখ্যা আমার জানানেই । আরও একটা ঘটনা ঘটতো , তিন তলার বন্ধঘরের নীচের ঘরে থাকলে শোনা যেত অবিকল কেউ যেন গুলি খেলছে , গড়িয়ে দিচ্ছে গুলি । কেউ কেউ অবশ্য বলেছিল --- বন্ধ ঘরে হাওয়ার কারসাজি এটা । হতেওপারে আমাদের কিন্তু অন্যরকম ভাবতেই ভালো লাগত। আমার জ্যাঠতুত দিদি ছোড়দির একটা খুব সুন্দর বাগান ঘেরা বাড়ী ছিল । আমাদের মায়ের চেয়ে বয়সে বেশ বড় ছোড়দির বাড়িতে সকলের জন্যে দরজা খোলা সবসময় । অনেককটি ছেলেমেয়ে , কেউ সমবয়সী ,কেউ বড় । ওইখানে বড় দাদারা প্ল্যানচেট করত। আমারা ঘরের বাইরে থেকে বুঝতে চেষ্টা করতাম ,ভেতরে কি হচ্ছে । ওরা নাকি শরতচন্দ্র কে ডাকতো । শরতচন্দ্রের বদলে আসতেন শ্রীকান্ত ! একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ,উনি কোথায় থাকেন ? উত্তর দিয়েছেলেন --"তোমাদের আতাগাছে " আতাগাছ টাকে এড়াবার উপায় নেই ,ওটার তলাদিয়ে যাওয়াআসা করতেই হবে । তাই সবার হাতেহাতে চাবি ধরিয়ে দেওয়া হল । লোহা থাকলে ভূত কোন ক্ষতি করতে পারেনা তাই ।


No comments:

Post a Comment