Thursday, 17 November 2011
আমাদের কলাকেন্দ্র । ......... কলাকেন্দ্র আমাদের নাচশেখার স্কুল ।আমাদের আনান্দনিকেতন । সাধারন টালির চালে ছাওয়া সেই স্কুলের সামনে খানিকটা খোলা জায়গায় একটা বড়ো গাছের নিচে সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বেদী করা ,গেরুয়া রঙের দেওয়ালে সুজাতা আর বুদ্ধদেবের fresco আমাদের ড্রইং মাস্টারমশাই অমলদার করা।বাঁশের কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘেরা আমদের কলাকেন্দ্র । যেন একটা আশ্রম । ভেতরে তিন চারটে ঘর .সবচেয়ে বড়ো ঘরটা নাচের ক্লাস । প্রিন্সিপ্যাল বঙ্কিম দা। শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করে আসা আরেকজন ছবি আঁকার মাস্টারমশাই ।আমাদের বাড়িতে বিয়ের সময় মাঝে মাঝে আল্পনা দিয়ে দিয়েছেন । অপূর্ব সেই আল্পনা । নাচ শিখতাম মণিপুর থেকে আসা দেবেন্দ্র সিংএর কাছে । খুব স্নেহ করতেন আমায় , বাড়িরনামের সঙ্গে একটা বাবু যোগ করে ডাকতেন । ছিলেন ক্লাসিকাল গানের রামপ্রসাদ জি ,মুখে সবসময় পান। ,দরাজ গলায় গান গাইতেন ,মজার মজার কথাও বলতেন । ,ছিলেন সেতারের কপিলদা । খুব মিষ্টি হাত ছিল সুন্দর দেখতে ছিলেন আর ছিলেন জয়ন্তী দি বাটিক আর ছুঁচের কাজের জন্য ।,শান্তিনিকেতন থেকে আসা সাদামাটা দেখতে । উড়িষ্যার লোক । শান্ত ছিলেন খুব । কপিলদা একদম উল্টো । অনেক কথা বলেতেন । সেই জয়ন্তীদি আর কপিলদার প্রেম হল । বেশ গোলমাল হল শহরে । কপিলদারা গোঁড়া মৈথিলী ব্রাহ্মণ । আমাদের বাড়ী ওদের রাখা হল নিরাপদে থাকবে বলে। , আমাদের বাড়ীর ডানপিঠে ,ডাকাবুকো ছেলেদের কেউ ঘাঁটাতনা বড়ো একটা ।তারপর আস্তে আস্তে মিটেও গেল গোলমাল। ,সরস্বতী পুজো হত খুব যত্ন করে একবার মনে আছে পুজোর পর অল্প ফল আর বোঁদে পড়ে আছে আর তখনও অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রসাদের জন্যে ,গোবিন্দ দা বলে একজন আমার আর আমার এক বন্ধু র হাতে প্রসাদের থালা ধরিয়ে দিয়ে বললেন “ শুন , মিঠিমিঠি হঁসনা থোঢ়ি থোঢ়ি দেনা ।"সেই মতই কাজ হল । পুজো হয়ে যাওয়ার পর ভোগের খিচুড়ি খেয়ে আমরা ঠাকুর দেখতে বেরতাম । কনকনে শীত পড়া শহরে শীত যাই যাই করেও যায়নি তখনও ।আমাদের সেই শুকনো হাওয়া বয়ে যাওয়া শহরের রাস্তা । কোথাও এতো চড়াই যে উল্টো দিক থেকে কেউ এলে , একটু একটু করে দেখতে পাওয়া যায় । কোথাও একদম ঢালু । অনেক দূর পর্যন্ত যেতাম হাঁটতে হাঁটতে । সঙ্গে বড় একজন কেউ থাকতেন । ঠাকুর আর কটা হত ! বেড়ানটাই আসল উদ্যেশ্য । বাড়ী থেকে এ সুযোগ পাওয়া যেতনা । একবার গেলাম নৌ লাক্ষা কোঠি দেখতে । বাড়ীটা করতে নাকি ন’লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল । সেই সময় অনেক টাকা । অনেকটা জায়গা নিয়ে বাড়ী ।কেউ থাকেনা , লোকে বলে ভুতের বাড়ী ।নির্জন দুপুরে ফাঁকা জায়গায় ঐ বিশাল বাড়ী দেখে সত্যি গা ছমছম করেছিল সেদিন । । মাঝে মাঝে ফাংশান হতো । বন্ধু রীতা অগ্রবালের কৃষ্ণের একটা solo performance থাকতো । খুব সুন্দর করতো ও । মনিপুরি কৃষ্ণের পোশাক আর তার সঙ্গে ময়ূর পাখা লাগান ভারী মুকুট। প্রত্যেক বার মাথাব্যথা করতো ঐ মুকুট পরার জন্যে , কিন্তু কিছুতেই অষুধ খেতে চাইতনা ,ওরা নেচারোপ্যথী করে , এলোপ্যাথী করবেনা । অমলদা ধমক দিয়ে খাওয়াতেন । যে কোন অনুষ্ঠানে আমাদের সাজাতেন অমল দা । একবার মনে আছে কারো ওপরে খুব রেগে ছিলেন ওই অবস্থায় এসেছেন আমাকে সাজাতে হাতে রঙ নিয়ে এত জোরে থাবড়ালেন যে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে, তখন এক ধমক আমায়" কাঁদছিস যে রঙ ধুয়েযাবেনা ?"বছরে একবার ২৬শে জানুয়ারী সারা বিহার নাচের প্রতিযোগিতা হত পাটনায়। রিহার্সালের জন্যে সময় বেশী পাওয়া যেতনা । তখন এনুয়্যাল পরীক্ষা ডিসেম্বারে হত । শেষের দিকে সেলাই , ড্রয়িং , মাটীর কাজ এই সমস্ত । পড়াশোনার পরীক্ষা শেষ হলেই আমরা রিহার্সাল সুরু করতাম । সকাল আটটা থেকে সুরু হত । কলাকেন্দ্র থেকে স্কুল বেশী দূর ছিলনা ।সকালে রিহার্সালের পর স্কুলে চলে আসতাম । বাড়ী থেকে খাবার পাঠিয়ে দিত , স্কুলে খেয়ে নিতাম । স্কুল থেকে আবার কলাকেন্দ্র । পাটনা যাওয়ার সময় ট্রেনে খুব মজা হত নাচের ক্লাশের বন্ধুরা অনেকেই স্কুলেরও বন্ধু ।সারা রাত জেগে বকবক করতে করতে যাওয়া । বড়দের বকুনি মাঝে মাঝে ঘুমনোর জন্যে । পাটনা পৌঁছে আমরা বঙ্কিমদার বন্ধু মহারথী জির কোয়ার্টারে উঠতাম , । দুটো ঘর দিতেন ওঁরা আমাদের। একটা ছেলেদের অন্যটা মেয়েদের জন্যে । দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বেরিয়ে যাওয়া হত অনুষ্ঠানের জন্য ,রাতে ফেরার সময় বাইরে থেকে খাওয়া দাওয়া করে এসে ঘুম,পরদিন সকালের ট্রেনে বাড়ী। এর মধ্যে একটাই দুঃখ,লম্বা হওয়ার জন্য আমার কোন দিন মেয়ে সাজা হয়নি ।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment