Tuesday, 13 December 2011
আমাদের শহরের শীত গ্রীষ্ম ///// by Madhuchhanda Paul on Monday, December 12, 2011 at 3:18pm বিহারে আমাদের শহরে শীত আর গ্রীষ্ম দুটোই খুব প্রবল ভাবে আসতো । এখন যেমন কলকাতাতেও খুব বেশী গরম পড়ে আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু আমরা তেমন দেখিনি । কলকাতার গরম মোটামুটি সহ্য করার মত ছিল । আর আমাদের তো গরম তেমন লাগতইনা ,আমাদের শহরের তুলনায় গরম কম পড়ত বলেই হয়তো ! গরমের ছুটি পড়ার আগে বেশ কিছুদিন মর্নিং স্কুল হত । বেলা সাড়ে দশটায় ছুটি হয়ে যেতো স্কুল । দুপুরে বাড়ীর সবাই তাড়াতাড়ি কাজকর্ম মিটিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত । সারা দুপুর লু চলত গরম হাওয়ার , সঙ্গে ধুলো উড়ত চারিদিক অন্ধকার করে । আওয়াজ হত হূঊ.................................। যখন ছোট ছিলাম, মনে আছে - ছোটকাকীমা আমাকে তার উঁচু খাটে তুলে দিয়ে , খেলনার আলমারি থেকে (তখন ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত । খেলার করার বয়স যায়নি তখনও । সঙ্গে অনেক খেলনা দেওয়া হত । একটা আলমারিও খেলনা রাখার জন্যে । আমার মারও ছিল । ) খেলনা বার করে দিয়ে ঘর থেকে বেরতে বারন করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যেত । যখন আরও খানিকটা বড় হয়েছি আমাদের এক জ্যাঠতুত দাদা খুব রাশভারী লালুদা।প্রায় আমার বাবার কাছাকাছি বয়স ।চেম্বার থেকে বাড়ী এসে আমাদের মানে আমরা যত জন ছোট আছি সবাইকে তার ঘরে ঢোকাত । নিজে থাকতো খাটে আর আমরা বড় সতরঞ্চিরতে মাটিতে । কেউ কারো দিকে ফিরে শোবেনা , কথা বলবেনা । আমরা মেয়েরা একদিকে শুতাম , আমাদের নিয়ে সমস্যা ছিলনা । ছেলে গুলো কথা বলত । মাঝে মাঝে লালুদার হুঙ্কার শোনা যেতো “কে কথা বলছে ? দেয়ালে মাথা ভটাভট করে ঠুকে দেবো।” অবশ্য কখনও কাউকে শাস্তি দেয়নি । হুঙ্কারেই কাজ হতো। আমরা বড় হওয়ার পর লালুদার এই কথাটা নিয়ে হাসাহাসি করেছি । দুপুরটা ঘরে আটকে রাখা জরুরী ছিল ।বাইরে বেরোলে লু লেগে যাওয়ার ভয় । বিকেলে ঘর থেকে বেরোলে দেখতাম , বারান্দার মাঝখান দিয়ে হাওয়া বয়ে গেছে আর বারান্দার দুপাশে হাওয়ার সঙ্গে আসা ধুলো জমে আছে ঢিপি করে । বিকেলে বারান্দা ধুতে হতো। রাতে আমরা অনেকেই ছাদে শুতাম । দুদিকে দুটো ছাদ ছিল । ছোট ছাদে বাড়ীর ছেলেরা আর অন্যটায় আমরা মেয়েরা শুতাম । সন্ধ্যেবেলা ছাদে বালতি বালতি জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হতো। মা কখনই ছাদে শুতনা পিসিমাও না। ছোটকাকীমা , জ্যাঠাইমা, বড়বৌদি এরকম আরও কারো সঙ্গে ঘুমতাম আমরা । দূষণ ছাড়া পরিস্কার আকাশ । নক্ষত্র পরিস্কার দেখা যেতো । কালপুরুষ , সপ্তর্ষি মণ্ডল ।পুর্নিমার কাছাকাছি এলে চাঁদের আলো এতো জোরাল হতো যে মনে হতো জোর পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । একবার কোন একটা ধুমকেতু দেখা গিয়েছিল ক’দিন ধরে মনে পড়ে । গরম কালের মজা ছিল আম খাওয়া । ভাঁড়ার ঘরের চৌকির তলায় শ’ দরে কেনা আম চটের ওপর বিছিয়ে রাখা থাকতো । রোজ সকালে পিসীমা সেখান থেকে তৈরী আম বেছে রান্নার বালতির জলে ভিজিয়ে রাখতো । তারপর সময় মত বোঁটার দিক থেকে খানিকটা কেটে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিত ,আমরা ছাড়িয়ে খেয়ে নিতাম ।একরকম ছোট আম খেয়েছি , বলতাম বিজু । পাকা আম ফুটো করে চুষে খেতে হতো । ছোটকাকীমা কাঁচা আম ছেঁচে কাসুন্দি আরও কিছু দিয়ে মেখে দিয়ে যেতো শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে তার মধ্যে করে । না চাইতেই । মনে আছে এই সময় ঝুড়ি করে আম পাঠানো হতো বিভিন্ন কুটুম বাড়ীতে । অনেক বছর পর কলকাতায় আমার দিদির শ্বশুরমশাই হাতে একটা আম দিয়ে বলেছিলেন “ তোমাদের দেশের আম , আঁটী পুঁতেছিলাম । বেশী ফলেনা কিন্তু খুব মিষ্টি ।’’ শীতও আসতো খুব দাপটের সঙ্গে । মোটামুটি কালীপূজোর সময় থেকেই ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । কার্ত্তিক মাসে নাকি লেপ বার করতে নেই তাই আশ্বিন মাসেই একবার লেপ গায়ে দিয়ে রাখা হতো । তার মানে কার্ত্তিক মাসেই লেপ গায়ে দেবার মত ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । হূ...হূ করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিত উত্তর থেকে । ঠোঁট ফেটে যেতো মনে পড়ে । মা সারাক্ষণ চটি পায়ে দাও আর গরম জামা পরো বলে হাঁকা হাঁকি করতো । ঐ দুটো জিনিষই পরতে ভালো লাগতনা । বড়দিনের ছুটি বেশ লম্বা হতো । আমরা প্রায় সারাদিন ছাদে রৌদ্রে থাকতাম । দুপুর বেলা ছাদে মাদুর পেতে মাথায় বালিশ দিয়ে জ্যাঠাইমা বেশ আয়েশ করে শুত আর ছোট কাকীমা গল্পের বই পড়ে শোনাত ।এই দৃশ্য রোজকার ছিল । আর আমি ছোটোকাকীমার একটু লালচে লম্বা চুল নিয়ে খেলা করতাম । চারগুছির বিনুনি করতাম , দুটো বিনুনি করতাম । কোনদিন একটুও আপত্তি করেনি , বিরক্ত হয়নি । কোনদিন লুডো খেলতাম । দিদি বউদিরা বুনত , সেলাই করতো ।গল্প করতো । বড় বৌদি মাঝে মাঝে উঠে খানিক পায়চারি করে নিত নইলে ঘুম পায় আর সবাই জানে দুপুরে ঘুমলে মোটা হয়ে যায় লোকে ! সকালে ছুটকি গয়লানি দুধ নিয়ে আসতো কেঁড়েতে করে তার ওপরে মাঠ্টা জমে থাকতো পুরু হয়ে । পিসিমা গোল গোল করে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে আমাদের দিত । অমৃত । শীতের সময় কোন কোন বার পিকনিক করতে যাওয়া হতো ।বেশীর ভাগই দাদাদের কোন পেসেন্টের বাগান বাড়িতে । বিরাট বড় দল ।দাদাদের বন্ধুরা থাকতো তাদের পরিবার নিয়ে ।আর যেতাম মন্দার হিল । বাসে করে বংশীতে গিয়ে নামলেই সামনে পাহাড় দেখা যেতো ,মনে হতো এক দৌড়ে পৌঁছে যাব কিন্তু আসলে দুরত্ব অনেকটাই । একটা দুটো গরুর গাড়ী ভাড়া করা হতো । কেউ হাঁটত কেউ গরুর গাড়ীতে উঠত । বাস থেকে নেমে হাটিয়া থেকে চাল ডাল মাটীর হাঁড়ী ইত্যাদি কিনে নেওয়া হতো । খিচুড়ি রেঁধে খাওয়ার জন্যে । মন্দার হিলে দেখার মত অনেক জায়গা ছিল । বলা হয়ে থাকে সমুদ্র মন্থনের সময় এই মন্দার পাহাড় হয়েছিল মন্থন দণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু । চিহ্ন স্বরূপ পাহাড়ের গায়ে সাপের আঁশের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় । পাহাড়ের গায়ে অনেক উঁচুতে একটি অপূর্ব নিখুঁত মুখ খোদাই করা আছে । ওটা নাকি বিষ্ণুর মুখাকৃতি ,বিশ্বকর্মার শিল্প কীর্তি। সাধারণ মানুষের পক্ষে অত উঁচুতে কাজটী করা সম্ভব বলে মনে হয়না। এছাড়া আছে আকাশ গঙ্গা । পাহাড়ের ওপরে একটি গুহা । গুহার ভেতরে একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে , শেষ দেখা যায়না । সেটা বিশেষ বিশেষ সময় জলে ভরে যায় ।আর ছিল কিছু জলের কুণ্ড পাহাড়ের ওপর , পরিষ্কার টলটলে জল ভরা । কতো কথা মনে পড়লো লিখতে গিয়ে । আমরা বলতাম “মান্দার হিল”। এখন নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে সব । হয়তো ভালো রাস্তা হয়েছে , আলো হয়েছে ,গরুর গাড়ী করে যেতে হয়না আর ।অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় “ মান্দার হিলে । ” আমার কিন্তু সেই মাটির অসমান রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথাই মনে পড়বে গরুর গাড়ী করে ঝাঁকুনি খেতে খেতে সন্ধের মুখে ফিরে চলা । গরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজ ঠং ঠং ! ````````````````````````````````````````আমাদের শহরের শীত গ্রীষ্ম ///// by Madhuchhanda Paul on Monday, December 12, 2011 at 3:18pm বিহারে আমাদের শহরে শীত আর গ্রীষ্ম দুটোই খুব প্রবল ভাবে আসতো । এখন যেমন কলকাতাতেও খুব বেশী গরম পড়ে আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু আমরা তেমন দেখিনি । কলকাতার গরম মোটামুটি সহ্য করার মত ছিল । আর আমাদের তো গরম তেমন লাগতইনা ,আমাদের শহরের তুলনায় গরম কম পড়ত বলেই হয়তো ! গরমের ছুটি পড়ার আগে বেশ কিছুদিন মর্নিং স্কুল হত । বেলা সাড়ে দশটায় ছুটি হয়ে যেতো স্কুল । দুপুরে বাড়ীর সবাই তাড়াতাড়ি কাজকর্ম মিটিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিত । সারা দুপুর লু চলত গরম হাওয়ার , সঙ্গে ধুলো উড়ত চারিদিক অন্ধকার করে । আওয়াজ হত হূঊ.................................। যখন ছোট ছিলাম, মনে আছে - ছোটকাকীমা আমাকে তার উঁচু খাটে তুলে দিয়ে , খেলনার আলমারি থেকে (তখন ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত । খেলার করার বয়স যায়নি তখনও । সঙ্গে অনেক খেলনা দেওয়া হত । একটা আলমারিও খেলনা রাখার জন্যে । আমার মারও ছিল । ) খেলনা বার করে দিয়ে ঘর থেকে বেরতে বারন করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে যেত । যখন আরও খানিকটা বড় হয়েছি আমাদের এক জ্যাঠতুত দাদা খুব রাশভারী লালুদা।প্রায় আমার বাবার কাছাকাছি বয়স ।চেম্বার থেকে বাড়ী এসে আমাদের মানে আমরা যত জন ছোট আছি সবাইকে তার ঘরে ঢোকাত । নিজে থাকতো খাটে আর আমরা বড় সতরঞ্চিরতে মাটিতে । কেউ কারো দিকে ফিরে শোবেনা , কথা বলবেনা । আমরা মেয়েরা একদিকে শুতাম , আমাদের নিয়ে সমস্যা ছিলনা । ছেলে গুলো কথা বলত । মাঝে মাঝে লালুদার হুঙ্কার শোনা যেতো “কে কথা বলছে ? দেয়ালে মাথা ভটাভট করে ঠুকে দেবো।” অবশ্য কখনও কাউকে শাস্তি দেয়নি । হুঙ্কারেই কাজ হতো। আমরা বড় হওয়ার পর লালুদার এই কথাটা নিয়ে হাসাহাসি করেছি । দুপুরটা ঘরে আটকে রাখা জরুরী ছিল ।বাইরে বেরোলে লু লেগে যাওয়ার ভয় । বিকেলে ঘর থেকে বেরোলে দেখতাম , বারান্দার মাঝখান দিয়ে হাওয়া বয়ে গেছে আর বারান্দার দুপাশে হাওয়ার সঙ্গে আসা ধুলো জমে আছে ঢিপি করে । বিকেলে বারান্দা ধুতে হতো। রাতে আমরা অনেকেই ছাদে শুতাম । দুদিকে দুটো ছাদ ছিল । ছোট ছাদে বাড়ীর ছেলেরা আর অন্যটায় আমরা মেয়েরা শুতাম । সন্ধ্যেবেলা ছাদে বালতি বালতি জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হতো। মা কখনই ছাদে শুতনা পিসিমাও না। ছোটকাকীমা , জ্যাঠাইমা, বড়বৌদি এরকম আরও কারো সঙ্গে ঘুমতাম আমরা । দূষণ ছাড়া পরিস্কার আকাশ । নক্ষত্র পরিস্কার দেখা যেতো । কালপুরুষ , সপ্তর্ষি মণ্ডল ।পুর্নিমার কাছাকাছি এলে চাঁদের আলো এতো জোরাল হতো যে মনে হতো জোর পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । একবার কোন একটা ধুমকেতু দেখা গিয়েছিল ক’দিন ধরে মনে পড়ে । গরম কালের মজা ছিল আম খাওয়া । ভাঁড়ার ঘরের চৌকির তলায় শ’ দরে কেনা আম চটের ওপর বিছিয়ে রাখা থাকতো । রোজ সকালে পিসীমা সেখান থেকে তৈরী আম বেছে রান্নার বালতির জলে ভিজিয়ে রাখতো । তারপর সময় মত বোঁটার দিক থেকে খানিকটা কেটে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিত ,আমরা ছাড়িয়ে খেয়ে নিতাম ।একরকম ছোট আম খেয়েছি , বলতাম বিজু । পাকা আম ফুটো করে চুষে খেতে হতো । ছোটকাকীমা কাঁচা আম ছেঁচে কাসুন্দি আরও কিছু দিয়ে মেখে দিয়ে যেতো শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে তার মধ্যে করে । না চাইতেই । মনে আছে এই সময় ঝুড়ি করে আম পাঠানো হতো বিভিন্ন কুটুম বাড়ীতে । অনেক বছর পর কলকাতায় আমার দিদির শ্বশুরমশাই হাতে একটা আম দিয়ে বলেছিলেন “ তোমাদের দেশের আম , আঁটী পুঁতেছিলাম । বেশী ফলেনা কিন্তু খুব মিষ্টি ।’’ শীতও আসতো খুব দাপটের সঙ্গে । মোটামুটি কালীপূজোর সময় থেকেই ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । কার্ত্তিক মাসে নাকি লেপ বার করতে নেই তাই আশ্বিন মাসেই একবার লেপ গায়ে দিয়ে রাখা হতো । তার মানে কার্ত্তিক মাসেই লেপ গায়ে দেবার মত ঠাণ্ডা পড়ে যেতো । হূ...হূ করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিত উত্তর থেকে । ঠোঁট ফেটে যেতো মনে পড়ে । মা সারাক্ষণ চটি পায়ে দাও আর গরম জামা পরো বলে হাঁকা হাঁকি করতো । ঐ দুটো জিনিষই পরতে ভালো লাগতনা । বড়দিনের ছুটি বেশ লম্বা হতো । আমরা প্রায় সারাদিন ছাদে রৌদ্রে থাকতাম । দুপুর বেলা ছাদে মাদুর পেতে মাথায় বালিশ দিয়ে জ্যাঠাইমা বেশ আয়েশ করে শুত আর ছোট কাকীমা গল্পের বই পড়ে শোনাত ।এই দৃশ্য রোজকার ছিল । আর আমি ছোটোকাকীমার একটু লালচে লম্বা চুল নিয়ে খেলা করতাম । চারগুছির বিনুনি করতাম , দুটো বিনুনি করতাম । কোনদিন একটুও আপত্তি করেনি , বিরক্ত হয়নি । কোনদিন লুডো খেলতাম । দিদি বউদিরা বুনত , সেলাই করতো ।গল্প করতো । বড় বৌদি মাঝে মাঝে উঠে খানিক পায়চারি করে নিত নইলে ঘুম পায় আর সবাই জানে দুপুরে ঘুমলে মোটা হয়ে যায় লোকে ! সকালে ছুটকি গয়লানি দুধ নিয়ে আসতো কেঁড়েতে করে তার ওপরে মাঠ্টা জমে থাকতো পুরু হয়ে । পিসিমা গোল গোল করে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে আমাদের দিত । অমৃত । শীতের সময় কোন কোন বার পিকনিক করতে যাওয়া হতো ।বেশীর ভাগই দাদাদের কোন পেসেন্টের বাগান বাড়িতে । বিরাট বড় দল ।দাদাদের বন্ধুরা থাকতো তাদের পরিবার নিয়ে ।আর যেতাম মন্দার হিল । বাসে করে বংশীতে গিয়ে নামলেই সামনে পাহাড় দেখা যেতো ,মনে হতো এক দৌড়ে পৌঁছে যাব কিন্তু আসলে দুরত্ব অনেকটাই । একটা দুটো গরুর গাড়ী ভাড়া করা হতো । কেউ হাঁটত কেউ গরুর গাড়ীতে উঠত । বাস থেকে নেমে হাটিয়া থেকে চাল ডাল মাটীর হাঁড়ী ইত্যাদি কিনে নেওয়া হতো । খিচুড়ি রেঁধে খাওয়ার জন্যে । মন্দার হিলে দেখার মত অনেক জায়গা ছিল । বলা হয়ে থাকে সমুদ্র মন্থনের সময় এই মন্দার পাহাড় হয়েছিল মন্থন দণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু । চিহ্ন স্বরূপ পাহাড়ের গায়ে সাপের আঁশের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় । পাহাড়ের গায়ে অনেক উঁচুতে একটি অপূর্ব নিখুঁত মুখ খোদাই করা আছে । ওটা নাকি বিষ্ণুর মুখাকৃতি ,বিশ্বকর্মার শিল্প কীর্তি। সাধারণ মানুষের পক্ষে অত উঁচুতে কাজটী করা সম্ভব বলে মনে হয়না। এছাড়া আছে আকাশ গঙ্গা । পাহাড়ের ওপরে একটি গুহা । গুহার ভেতরে একটা সুড়ঙ্গ চলে গেছে , শেষ দেখা যায়না । সেটা বিশেষ বিশেষ সময় জলে ভরে যায় ।আর ছিল কিছু জলের কুণ্ড পাহাড়ের ওপর , পরিষ্কার টলটলে জল ভরা । কতো কথা মনে পড়লো লিখতে গিয়ে । আমরা বলতাম “মান্দার হিল”। এখন নিশ্চয় অনেক বদলে গেছে সব । হয়তো ভালো রাস্তা হয়েছে , আলো হয়েছে ,গরুর গাড়ী করে যেতে হয়না আর ।অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় “ মান্দার হিলে । ” আমার কিন্তু সেই মাটির অসমান রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথাই মনে পড়বে গরুর গাড়ী করে ঝাঁকুনি খেতে খেতে সন্ধের মুখে ফিরে চলা । গরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজ ঠং ঠং ! ````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````
Saturday, 3 December 2011
উর্দুবাজারের বাড়ী শহরের বাইরে বাবা একটা ছোট বাড়ী করেছিল । প্রায় এক বিঘে জমির ওপর গোটা দুই বেশ বড়ো ঘর ।বড়ো চওড়া বারান্দা , মোটামুটি বড়ো উঠোনের একদিকে রান্নাঘর , অন্যদিকে বাথরুম ইত্যাদি । আর বাকি জমিতে কাগজি লেবু, পেয়ারা এই রকম কিছু গাছ । আর দুটো খুব বড় রক্তকরবীর ঝোপ । বাকিটা খালি পড়ে থাকা জমি । একটা অনেক বড় গাছ ছিল ছিল , সেটাকে আমরা জিওল গাছ বলতাম । গাছটা ছিল কুঁয়োর পাড়ে । ছোট ছোট ডাল পাতা সমস্ত ছাঁটা । বেশ ওপরে ইংরেজী ভি অক্ষরের মত দুটো ডাল তার মাঝখান দিয়ে একটা প্রমান মাপের বাঁশ পার করিয়ে দেওয়া , মোটা দিকটায় একটা বস্তায় বালি ভরে বাঁধা ,ভারী করার জন্যে আর সামনের দিকটায় একটা লম্বা দড়ির আগায় একটা বালতি জাতীয় কিছু বাঁধা ,ঠিক বালতি নয় তলাটা দুদিক থেকে এসে সরু হয়ে গেছে । ওটা ছিল কুঁয়ো থেকে জল তোলার জন্যে ।দড়িটা ধরে টেনে জলের পাত্রটাকে কুঁয়োয় ডুবিয়ে দিলে জল ভরে যাওয়ার পর পরিশ্রম ছাড়াই জল শুদ্ধ পাত্রটা ওপরে উঠে আসে। এটাকে লাটাখাম্বা বলতাম । উর্দুবাজারের বাড়ীতে কলের জল ছিলনা ,কাজের লোক ওইভাবে জল তুলে কলঘরের চৌবাচ্চা ভরে রাখতো ।জমিতে জল দিত। ইলেকট্রিকের আলো ছিলনা । হ্যরিকেন জ্বলত । আমরা তিন ভাই বোন আর মা থাকতাম আর আমাদের লোম ওয়ালা , লম্বা কানের টোগো । দিদিও আসতো শ্বশুরবাড়ি থেকে । বেশ আনান্দেই কাটত সময় । আমরা সেই বাড়িতে মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতাম । কোনকিছু না থাকা গায়েই লাগতনা । একবার প্রায় ১ বছর ছিলাম ওখানে ।মার শরীর খারাপ যাচ্ছিল । খোলা মেলা পরিবেশে থাকার জন্যে গিয়ে- ছিলাম । ওখান থেকেই স্কুল করেছি ।কিছুদুর গিয়ে রিক্সা পাওয়া যেত। সেবার শীতকালে দাদাএক বন্ধুকে নিয়ে এসে তুলল বাড়িতে, নাম সুধাংশু ।তখন বোধহয় দাদার বয়স ১৭/১৮ হবে । শুধাংশুদা অনেকটাই বড় দাদার থেকে । টি . বি হয়েছে তার । দুস্থ খুব ।আমাদের বাড়ীতে থাকবে । পুষ্টিকর খাবার খাবে আর আমাদের জ্যাঠতুত দাদাদের দিয়ে চিকিৎসা করাবে । আর সব কিছুতে রাজী হলেও মা বাড়ীতে থাকতে দেওয়ার ব্যপারে একবারে বেঁকে বসলো । এক বাড়ীতে ঐ রকম ছোঁয়াচে রুগীকে মা থাকতে দিতে রাজী হলনা । শৈশবে পিতৃহীন সন্তানদের ওপর , বিশেষ করে দাদার ওপর মার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল ।অনেক সময় অনেক অন্যায্য কথা মেনে নিলেও এ বারে মা অনড়। একবারে জমির শেষ প্রান্তে একটা টালির ঘর ছিল যদি কখনও মালি রাখা হয় মনে করে , যদিও রাখার দরকার হয়নি বাইরে থেকে এসে কাজ করে দিত চাষি । ঘরটা ভালোই । শুকনো খটখটে । খোলামেলা তো ঐখানে মা ব্যবস্থা করে দিল থাকার । দাদাও কোথা থেকে একটা দড়ির খাটিয়া জোগাড় করে ওইঘরেই নিজের বিছানা পাতলো । মা কিছুই বললনা ।কিন্তু পুষ্টিকর খাওয়া দাওয়, খোলামেলা জায়গায় থাকা কিছুতেই কোন উন্নতি হলনা সুধাংশুদার শরীরের । শেষে হাসপাতালে দেওয়া হল । সেখানেই মারা গেলো দাদার সেই বন্ধু । দাদা কদিন গুম হয়ে রইল । কিছুদিন পরে বন্ধুর একটা ছবি বাঁধিয়ে নিয়ে এল । নিচে লেখা “যে ফুল না ফুটিতে/ ঝরিল ধরণীতে / যে নদী .........” খুব অবাক লেগেছিল ।মাত্র ক’দিন আগে দেখাছি , ওদের ঘরের সামনে রোদে বসে দুজনে কথা বলছে বা দাদা পড়ছে , সুধাংশুদা খবরের কাগজ পড়ছে। সেই মানুষটা কিকরে নেই হয়ে গেলো ভেবেপাইনি।
Subscribe to:
Posts (Atom)