Saturday, 3 December 2011

উর্দুবাজারের বাড়ী শহরের বাইরে বাবা একটা ছোট বাড়ী করেছিল । প্রায় এক বিঘে জমির ওপর গোটা দুই বেশ বড়ো ঘর ।বড়ো চওড়া বারান্দা , মোটামুটি বড়ো উঠোনের একদিকে রান্নাঘর , অন্যদিকে বাথরুম ইত্যাদি । আর বাকি জমিতে কাগজি লেবু, পেয়ারা এই রকম কিছু গাছ । আর দুটো খুব বড় রক্তকরবীর ঝোপ । বাকিটা খালি পড়ে থাকা জমি । একটা অনেক বড় গাছ ছিল ছিল , সেটাকে আমরা জিওল গাছ বলতাম । গাছটা ছিল কুঁয়োর পাড়ে । ছোট ছোট ডাল পাতা সমস্ত ছাঁটা । বেশ ওপরে ইংরেজী ভি অক্ষরের মত দুটো ডাল তার মাঝখান দিয়ে একটা প্রমান মাপের বাঁশ পার করিয়ে দেওয়া , মোটা দিকটায় একটা বস্তায় বালি ভরে বাঁধা ,ভারী করার জন্যে আর সামনের দিকটায় একটা লম্বা দড়ির আগায় একটা বালতি জাতীয় কিছু বাঁধা ,ঠিক বালতি নয় তলাটা দুদিক থেকে এসে সরু হয়ে গেছে । ওটা ছিল কুঁয়ো থেকে জল তোলার জন্যে ।দড়িটা ধরে টেনে জলের পাত্রটাকে কুঁয়োয় ডুবিয়ে দিলে জল ভরে যাওয়ার পর পরিশ্রম ছাড়াই জল শুদ্ধ পাত্রটা ওপরে উঠে আসে। এটাকে লাটাখাম্বা বলতাম । উর্দুবাজারের বাড়ীতে কলের জল ছিলনা ,কাজের লোক ওইভাবে জল তুলে কলঘরের চৌবাচ্চা ভরে রাখতো ।জমিতে জল দিত। ইলেকট্রিকের আলো ছিলনা । হ্যরিকেন জ্বলত । আমরা তিন ভাই বোন আর মা থাকতাম আর আমাদের লোম ওয়ালা , লম্বা কানের টোগো । দিদিও আসতো শ্বশুরবাড়ি থেকে । বেশ আনান্দেই কাটত সময় । আমরা সেই বাড়িতে মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতাম । কোনকিছু না থাকা গায়েই লাগতনা । একবার প্রায় ১ বছর ছিলাম ওখানে ।মার শরীর খারাপ যাচ্ছিল । খোলা মেলা পরিবেশে থাকার জন্যে গিয়ে- ছিলাম । ওখান থেকেই স্কুল করেছি ।কিছুদুর গিয়ে রিক্সা পাওয়া যেত। সেবার শীতকালে দাদাএক বন্ধুকে নিয়ে এসে তুলল বাড়িতে, নাম সুধাংশু ।তখন বোধহয় দাদার বয়স ১৭/১৮ হবে । শুধাংশুদা অনেকটাই বড় দাদার থেকে । টি . বি হয়েছে তার । দুস্থ খুব ।আমাদের বাড়ীতে থাকবে । পুষ্টিকর খাবার খাবে আর আমাদের জ্যাঠতুত দাদাদের দিয়ে চিকিৎসা করাবে । আর সব কিছুতে রাজী হলেও মা বাড়ীতে থাকতে দেওয়ার ব্যপারে একবারে বেঁকে বসলো । এক বাড়ীতে ঐ রকম ছোঁয়াচে রুগীকে মা থাকতে দিতে রাজী হলনা । শৈশবে পিতৃহীন সন্তানদের ওপর , বিশেষ করে দাদার ওপর মার যথেষ্ট দুর্বলতা ছিল ।অনেক সময় অনেক অন্যায্য কথা মেনে নিলেও এ বারে মা অনড়। একবারে জমির শেষ প্রান্তে একটা টালির ঘর ছিল যদি কখনও মালি রাখা হয় মনে করে , যদিও রাখার দরকার হয়নি বাইরে থেকে এসে কাজ করে দিত চাষি । ঘরটা ভালোই । শুকনো খটখটে । খোলামেলা তো ঐখানে মা ব্যবস্থা করে দিল থাকার । দাদাও কোথা থেকে একটা দড়ির খাটিয়া জোগাড় করে ওইঘরেই নিজের বিছানা পাতলো । মা কিছুই বললনা ।কিন্তু পুষ্টিকর খাওয়া দাওয়, খোলামেলা জায়গায় থাকা কিছুতেই কোন উন্নতি হলনা সুধাংশুদার শরীরের । শেষে হাসপাতালে দেওয়া হল । সেখানেই মারা গেলো দাদার সেই বন্ধু । দাদা কদিন গুম হয়ে রইল । কিছুদিন পরে বন্ধুর একটা ছবি বাঁধিয়ে নিয়ে এল । নিচে লেখা “যে ফুল না ফুটিতে/ ঝরিল ধরণীতে / যে নদী .........” খুব অবাক লেগেছিল ।মাত্র ক’দিন আগে দেখাছি , ওদের ঘরের সামনে রোদে বসে দুজনে কথা বলছে বা দাদা পড়ছে , সুধাংশুদা খবরের কাগজ পড়ছে। সেই মানুষটা কিকরে নেই হয়ে গেলো ভেবেপাইনি।


No comments:

Post a Comment