Saturday, 12 November 2011

আমাদের স্কুল ।

                           আমাদের স্কুল ।

আমাদের বাড়ীর  মেয়েরা  প্রায়   সবাই-ই  শহরের  খৃষ্টান   মিশনারিদের  স্কুলে  পড়াশোনা  করেছি । একটা  উঁচু  ঘাসজমির  ওপর  স্কুল   বাড়ী ।  ঘাসজমির  মাঝখান  দিয়ে  বেশ কিছু সিঁড়ির  ধাপ  উঠে তবে  স্কুলের  গেট । তো একদিন  সকালে  আমাদের  এক  জ্যাঠতুত দিদি , স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রীর  হাত  ধরে  আমি  আর  আমার  ১৯  দিনের  ছোট  জ্যাঠতুত  বোন  সেই  গেটের  ভেতর  ঢুকলাম ।  আট  বছর  বয়েসে ।  উদ্যেশ্য  ক্লাশ টু  তে ভর্তি  হওয়া ।সে সময়  বয়স  নিয়ে  এত  কড়াকড়ি  ছিলনা ।  পরীক্ষার  পর  দেখা গেল  দুজনেই  অঙ্কে  ফেল ।    তাই   ক্লাশ  ওয়ান এ  ভর্তি  হতে  হল ।  স্কুল থেকে   বলা  হলএন্যুয়ালের    এর রেসাল্ট     ভালো  হলে  একবারে ক্লাস  থ্রী   তে  তুলে দেওয়া  হবে । রেসাল্ট         বেরোলে  দেখা  গেল  শুধু  ভালো  নয়  অতি ভালো  হয়েছে দুজনেরই ।  কাজেই  ক্লাস  থ্রী ।  একতলা  এল শেপের  বাড়ী ।  একপাশে  খানিকটা  দোতলা । অফিসের কাজকর্মের  জন্যে ।  ঢুকে বাঁ দিকে   ফুলের  বাগান । নিয়মিত  পরিচর্যা করা উলটোদিকে  স্কুলবাড়ী ,  তার  পেছনে  মাঠ  খেলার ।  পাঁচিলের  ধারে  একসারি  এসবেস্টাস  ছাওয়া  ঘর , খুচরো  ক্লাসের জন্যে ।  তার  সামনেও  বাগান ।  একটা  বিশাল  নিমগাছ  অনেকটা  জায়গা  জুড়ে  দাঁড়িয়ে  আমরা বলতাম  নিমতলা ।  কলকাতা  থেকে  একজন  টিচার   এসেছিলেন  আমাদের  স্কুলে  পড়াতে ,     নিমতলা  শুনে  হেসেছিলেন  , বলেছিলেন  - ‘আমরা , কলকাতার লোকেরা  নিমতলা  বলতে  অন্যকিছু  বুঝি ।‘’ আমরা  বিহারের  মানুষ  মাঝে সাঝে  কলকাতায়  আসি নিমতলা ঘাটের   নামও  শুনিনি উনিই  ব্যখ্যা করে  দিয়েছিলেন । স্বাভাবিক  ভাবেই  বিহারী মেয়ের  সংখ্যা অনেক  বেশী  সব ক্লাশেই । ভার্নাকুলার  পিরিয়ডে    আমরা  বাংলা ক্লাশ  করতে  নিমতলায়  চলে যেতাম মাটীতে  ছড়িয়ে  ছিটিয়ে  বসতাম । মিস  বসতেন  টুলে । হিন্দি ভাষীরা  ক্লাশরুমে থাকতো । অন্য সব ক্লাশ  একসঙ্গেই  হত  বাংলা  আর হিন্দি  মিলিয়ে  ,  ওরাও  বুঝত  আমরাও ।  অসুবিধে  হতনা ।  
       বিশাল বড়  হল ছিল একটা ।অ্যানেক্স ।      সেখানে  আমাদের   প্রেয়ার  হত । স্কুল  শুরুর আগে আর স্কুল  শেষের পর । প্রেয়ার  শুরু হত ঈশ্বর  অথবা  যীশুর  মহিমা বর্ণনা  করে  আর শেষ  হত  আমেন  দিয়ে    মোটামুটী  একই রকম  দুবারঅ্যানেক্স   এর পর  অনেক  উঁচু  পাঁচিল  ওপাশে   জেলা   স্কুলের  মাঠ ।  ছেলেদের  স্কুল ।               
             আমরা  টিচারদের   পদবীর  আগে  মিস যোগ করে  ডাকতাম  , যেমন ,  মিস  কবিরাজ ,  মিস  মণ্ডল , মিস  তরফদার ,  মিস  হরো  ইত্যাদি ।  খৃষ্টান  টিচারেরা  সবাই  মিস  ছিলেন ।   বাইরে  থেকে  যারা  পড়াতে  আসতেন   তাঁরা  বেশির  ভাগই  মিসেস ।   একজন  বিদেশী   টিচার  ছিলেন  ,মিস  পিকক্‌   খুব  লম্বা ।  আমাদের  পিয়ানো   শেখানোর চেষ্টা  করতেন । কত  যে  স্নেহ   পেয়েছি  তাঁর কাছে  বলতে  পারিনা । মিস  কবিরাজ  দিদিদেরও  পড়িয়েছেন , অনেকদিন  আছেন  স্কুলে ।   কিছু দোষ  করলেই   ডান হাত  দেখিয়ে  বলতেন , ‘এই  হাতে  তোমার দিদিদেরও  পড়িয়েছি । ‘ হাত  দিয়ে  কিকরে  পড়াতেন  জানা হয়নি ।  রেসাল্ট  বেরোনোর  দিন     হেড মিস্ট্রেস  নিজে  প্রত্যেক  ক্লাশে  গিয়ে  রেসাল্ট  পড়ে  শোনাতেন । আমার  সময়  এলেই  চশমার  ওপর দিয়ে  তাকিয়ে  বলতেন  , আরও  ভালো  করতে  হবে ।  তোমাদের  দিদিরা ‘ ......ইত্যাদি ।  লজ্জা  করত । 
            প্রত্যেক  বছর  বড়দিনের  ছুটির আগে  যীশুর  জন্মের  ঘটনা  অভিনয়  করা হত মিস পিকক্‌    খৃস্টমাস  ক্যরল  প্র্যাকটিস  করাতেন পিয়ানোর  সঙ্গে ।  কানে পরিস্কার  ভেসে আসে  মিস পিকক্‌এর সরু  গলার  সঙ্গে  আমাদের  সমবেত  গলার গান ।  আমরা  বলতাম  ‘মেষপালক’  বলতাম  ‘বনিক’  বলতাম  ‘উপঢৌকন’ ।   তো  মেষপালক  আর বনিকদের  যীশুর জন্যে  নিয়ে আসা  ‘উপঢৌকন’ তৈরী করতাম  আমরা ।  বেশ  জমকালো দেখতে ।  তারপর  সি  এম   এস  স্কুলের  হলে  অভিনয়  হত।  ওটাও  খৃষ্টান মিশনারীদেরই স্কুল , ছেলেদের  জন্যে ।  
         আমাদের  স্কুলের  কাছেই  চার্চ । খুব বেশী না হলেও  কখন সখন  কোন  কারনে  নিয়ে  গিয়েছে  স্কুল থেকে । চার্চের মাঠ বেশ  বড় সড় তার  মাঝখানে  চার্চ    দুরেদুরে  দুএকটা  বড় গাছ । সব মিলিয়ে একটা ছবি যেন ।  
       ক্লাশ  টেনের  মেয়েরা    সরস্বতী  পুজো করতো । স্কুলের  ভেতর পূজো করার অনুমতি  ছিলনা  । বাইরে  কাছাকাছি  কোন  স্কুলের  মেয়ের  বাড়ীর  বারান্দায়  হত  পুজো । আমাদের পুজোর  পালার  সময়  এক বন্ধুর  বাড়ীর  বারান্দা  আর  বসার ঘর  পেলাম ।  বাড়ী থেকে  সে জায়গা  অনেকটাই দূর । আমি আর আমার  মানিক জোড়  বোন  আর  সকলের  মত আগের দিন  দুপুর বেলা  রিক্সা  করে গিয়ে হাজির  হলাম  ঠাকুর  সাজাতে ।  সঙ্গে  সাইকেলে  এক  জ্যাঠতুত  দাদা  অনেক  আগে আগে । পৌঁছে দিতে আমাদের । যদিও  কোনই  দরকার  ছিলনা , কিন্তু  বাড়ীর  বড়দের  নির্দেশ আবার  সন্ধ্যেবেলা  নিতে  আসবে ।  পুজোর ভাসান  পর্যন্ত  এই  ডিউটি ওর ।  মনে  হয়না  খুশী  হয়ে  করতো  বলে । অনেক  আগে আগে  চালিয়ে যেত  সাইকেল । আমাদের  পুজোরদিন  সকাল  দশটা  নাগাদ  একটি  পরিচিত  গাড়ী  এসে  রাস্তার উলটো  দিকে  দাঁড়াল ।  নামলেন  আমাদের  শহরের  নামকরা   এক  ডাক্তার  বাবু  যিনি  আবার  বিখ্যাত  একজন  লেখকও ।   বাঙালি। ওঁর  বাগান  থেকে  ভোররাতে  কারা  ফুল  চুরি  করে এনেছে  উনি  দেখেলেই  চিনতে  পারবেন ,  তাঁর বাগানের  ফুল  কিনা । তাই যেখানে  স্কুল কলেজের  পূজো  হচ্ছে  উনি   ঘুরে  ঘুরে  দেখছেন ।  অবশ্য  আমাদের  দেখে কি  মনে হল  জানিনা  দেখতে  এলেননা ।   পুজো  হয়ে যাওয়ার পর ,  যাদের  যাদের  বয় ফ্রেন্ড  হয়েছে  তারা  , বন্ধুদের  জন্যে    স্পেশ্যাল    প্রসাদের  প্লেট  সাজাত । আলাদা করে  সরিয়ে  রাখত । আমরা  খুব  উৎসাহিত  একবার  দেখতে  পাবো  বন্ধুর  বিশেষ  জনকে ।  এই  সুযোগে  একবার , দুবার  তো আসবেই ।
         পুজো মিটে  যাওয়ার  পর আমাদের   রাঙাদি  এক  ভীষণ  কথা  বলল  । আমাদের  পরিচিত  একজনের  নাম  করে  জানাল ।ওঁদের  আমায় ওঁদের ছেলের  জন্যে  পছন্দ  হয়েছে ।সরস্বতী  পুজোর সময় দেখে । , কথা  বলতে  চান । মা তখন  কলকাতায়  এসেছে । মা  ফিরলেই  কথা  হবে ।  রাঙাদি  বয়সে  অনেক  বড়  , খুব  মেনে চলি , কিন্তু  সেদিন  কত কিছু  বলেছিলাম    খুব  নিষ্ঠুর  মনে হচ্ছিল । অসহায়  লাগছিল ।  মনে হচ্ছিল  যাদের  আমি এত  ভালবাসি  তারা  আমার  কোন  কথা  বুঝছেনা কেন । পরে  শুনলাম  সবটাই   ঠাট্টা । ওঁরা  কথা  বলতে  চেয়েছিলেন  ঠিকই  কিন্তু  তক্ষুনি  না  বলে  দেওয়া হয়েছে ।

No comments:

Post a Comment