আমাদের স্কুল ।
আমাদের বাড়ীর মেয়েরা প্রায় সবাই-ই শহরের খৃষ্টান মিশনারিদের স্কুলে পড়াশোনা করেছি । একটা উঁচু ঘাসজমির ওপর স্কুল বাড়ী । ঘাসজমির মাঝখান দিয়ে বেশ কিছু সিঁড়ির ধাপ উঠে তবে স্কুলের গেট । তো একদিন সকালে আমাদের এক জ্যাঠতুত দিদি , স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রীর হাত ধরে আমি আর আমার ১৯ দিনের ছোট জ্যাঠতুত বোন সেই গেটের ভেতর ঢুকলাম । আট বছর বয়েসে । উদ্যেশ্য ক্লাশ টু তে ভর্তি হওয়া ।সে সময় বয়স নিয়ে এত কড়াকড়ি ছিলনা । পরীক্ষার পর দেখা গেল দুজনেই অঙ্কে ফেল । তাই ক্লাশ ওয়ান এ ভর্তি হতে হল । স্কুল থেকে বলা হল।এন্যুয়ালের এর রেসাল্ট ভালো হলে একবারে ক্লাস থ্রী তে তুলে দেওয়া হবে । রেসাল্ট বেরোলে দেখা গেল শুধু ভালো নয় অতি ভালো হয়েছে দুজনেরই । কাজেই ক্লাস থ্রী । একতলা এল শেপের বাড়ী । একপাশে খানিকটা দোতলা । অফিসের কাজকর্মের জন্যে । ঢুকে বাঁ দিকে ফুলের বাগান । নিয়মিত পরিচর্যা করা । উলটোদিকে স্কুলবাড়ী , তার পেছনে মাঠ খেলার । পাঁচিলের ধারে একসারি এসবেস্টাস ছাওয়া ঘর , খুচরো ক্লাসের জন্যে । তার সামনেও বাগান । একটা বিশাল নিমগাছ অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে । আমরা বলতাম নিমতলা । কলকাতা থেকে একজন টিচার এসেছিলেন আমাদের স্কুলে পড়াতে , নিমতলা শুনে হেসেছিলেন , বলেছিলেন - ‘আমরা , কলকাতার লোকেরা নিমতলা বলতে অন্যকিছু বুঝি ।‘’ আমরা বিহারের মানুষ মাঝে সাঝে কলকাতায় আসি নিমতলা ঘাটের নামও শুনিনি । উনিই ব্যখ্যা করে দিয়েছিলেন । স্বাভাবিক ভাবেই বিহারী মেয়ের সংখ্যা অনেক বেশী সব ক্লাশেই । ভার্নাকুলার পিরিয়ডে আমরা বাংলা ক্লাশ করতে নিমতলায় চলে যেতাম । মাটীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতাম । মিস বসতেন টুলে । হিন্দি ভাষীরা ক্লাশরুমে থাকতো । অন্য সব ক্লাশ একসঙ্গেই হত বাংলা আর হিন্দি মিলিয়ে , ওরাও বুঝত আমরাও । অসুবিধে হতনা ।
বিশাল বড় হল ছিল একটা ।অ্যানেক্স । সেখানে আমাদের প্রেয়ার হত । স্কুল শুরুর আগে আর স্কুল শেষের পর । প্রেয়ার শুরু হত ঈশ্বর অথবা যীশুর মহিমা বর্ণনা করে আর শেষ হত আমেন দিয়ে । মোটামুটী একই রকম দুবার। অ্যানেক্স এর পর অনেক উঁচু পাঁচিল ওপাশে জেলা স্কুলের মাঠ । ছেলেদের স্কুল ।
আমরা টিচারদের পদবীর আগে মিস যোগ করে ডাকতাম , যেমন , মিস কবিরাজ , মিস মণ্ডল , মিস তরফদার , মিস হরো ইত্যাদি । খৃষ্টান টিচারেরা সবাই মিস ছিলেন । বাইরে থেকে যারা পড়াতে আসতেন তাঁরা বেশির ভাগই মিসেস । একজন বিদেশী টিচার ছিলেন ,মিস পিকক্ খুব লম্বা । আমাদের পিয়ানো শেখানোর চেষ্টা করতেন । কত যে স্নেহ পেয়েছি তাঁর কাছে বলতে পারিনা । মিস কবিরাজ দিদিদেরও পড়িয়েছেন , অনেকদিন আছেন স্কুলে । কিছু দোষ করলেই ডান হাত দেখিয়ে বলতেন , ‘এই হাতে তোমার দিদিদেরও পড়িয়েছি । ‘ হাত দিয়ে কিকরে পড়াতেন জানা হয়নি । রেসাল্ট বেরোনোর দিন হেড মিস্ট্রেস নিজে প্রত্যেক ক্লাশে গিয়ে রেসাল্ট পড়ে শোনাতেন । আমার সময় এলেই চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বলতেন , আরও ভালো করতে হবে । তোমাদের দিদিরা ‘ ......ইত্যাদি । লজ্জা করত ।
প্রত্যেক বছর বড়দিনের ছুটির আগে যীশুর জন্মের ঘটনা অভিনয় করা হত । মিস পিকক্ খৃস্টমাস ক্যরল প্র্যাকটিস করাতেন পিয়ানোর সঙ্গে । কানে পরিস্কার ভেসে আসে মিস পিকক্এর সরু গলার সঙ্গে আমাদের সমবেত গলার গান । আমরা বলতাম ‘মেষপালক’ বলতাম ‘বনিক’ বলতাম ‘উপঢৌকন’ । তো মেষপালক আর বনিকদের যীশুর জন্যে নিয়ে আসা ‘উপঢৌকন’ তৈরী করতাম আমরা । বেশ জমকালো দেখতে । তারপর সি এম এস স্কুলের হলে অভিনয় হত। ওটাও খৃষ্টান মিশনারীদেরই স্কুল , ছেলেদের জন্যে ।
আমাদের স্কুলের কাছেই চার্চ । খুব বেশী না হলেও কখন সখন কোন কারনে নিয়ে গিয়েছে স্কুল থেকে । চার্চের মাঠ বেশ বড় সড় তার মাঝখানে চার্চ । দুরেদুরে দুএকটা বড় গাছ । সব মিলিয়ে একটা ছবি যেন ।
ক্লাশ টেনের মেয়েরা সরস্বতী পুজো করতো । স্কুলের ভেতর পূজো করার অনুমতি ছিলনা । বাইরে কাছাকাছি কোন স্কুলের মেয়ের বাড়ীর বারান্দায় হত পুজো । আমাদের পুজোর পালার সময় এক বন্ধুর বাড়ীর বারান্দা আর বসার ঘর পেলাম । বাড়ী থেকে সে জায়গা অনেকটাই দূর । আমি আর আমার মানিক জোড় বোন আর সকলের মত আগের দিন দুপুর বেলা রিক্সা করে গিয়ে হাজির হলাম ঠাকুর সাজাতে । সঙ্গে সাইকেলে এক জ্যাঠতুত দাদা অনেক আগে আগে । পৌঁছে দিতে আমাদের । যদিও কোনই দরকার ছিলনা , কিন্তু বাড়ীর বড়দের নির্দেশ । আবার সন্ধ্যেবেলা নিতে আসবে । পুজোর ভাসান পর্যন্ত এই ডিউটি ওর । মনে হয়না খুশী হয়ে করতো বলে । অনেক আগে আগে চালিয়ে যেত সাইকেল । আমাদের পুজোরদিন সকাল দশটা নাগাদ একটি পরিচিত গাড়ী এসে রাস্তার উলটো দিকে দাঁড়াল । নামলেন আমাদের শহরের নামকরা এক ডাক্তার বাবু যিনি আবার বিখ্যাত একজন লেখকও । বাঙালি। ওঁর বাগান থেকে ভোররাতে কারা ফুল চুরি করে এনেছে উনি দেখেলেই চিনতে পারবেন , তাঁর বাগানের ফুল কিনা । তাই যেখানে স্কুল কলেজের পূজো হচ্ছে উনি ঘুরে ঘুরে দেখছেন । অবশ্য আমাদের দেখে কি মনে হল জানিনা দেখতে এলেননা । পুজো হয়ে যাওয়ার পর , যাদের যাদের বয় ফ্রেন্ড হয়েছে তারা , বন্ধুদের জন্যে স্পেশ্যাল প্রসাদের প্লেট সাজাত । আলাদা করে সরিয়ে রাখত । আমরা খুব উৎসাহিত একবার দেখতে পাবো বন্ধুর বিশেষ জনকে । এই সুযোগে একবার , দুবার তো আসবেই ।
পুজো মিটে যাওয়ার পর আমাদের রাঙাদি এক ভীষণ কথা বলল । আমাদের পরিচিত একজনের নাম করে জানাল ।ওঁদের আমায় ওঁদের ছেলের জন্যে পছন্দ হয়েছে ।সরস্বতী পুজোর সময় দেখে । , কথা বলতে চান । মা তখন কলকাতায় এসেছে । মা ফিরলেই কথা হবে । রাঙাদি বয়সে অনেক বড় , খুব মেনে চলি , কিন্তু সেদিন কত কিছু বলেছিলাম । খুব নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল । অসহায় লাগছিল । মনে হচ্ছিল যাদের আমি এত ভালবাসি তারা আমার কোন কথা বুঝছেনা কেন । পরে শুনলাম সবটাই ঠাট্টা । ওঁরা কথা বলতে চেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তক্ষুনি না বলে দেওয়া হয়েছে ।
No comments:
Post a Comment