ছোড়দির বাড়ী //
। আমাদের
জ্যাঠতুতো দিদি ছোড়দির
বাড়ীতে যে কতো আনন্দের
মুহুর্ত কাটিয়েছি নিজেরই হিসেব নেই
। কতো
দৌরাত্ম্য করেছি । ফুল ছিঁড়েছি , গাছে চড়তে গিয়ে
পড়েছি । গাছের ডাল ভেঙেছি ।
কেউ কিছু বলেনি কোন দিন ।র বেলা বাজার
বসতো । আসলে ওটা ছিল আমাদেরই , একসময় খালি
আমাদের বাড়ীর উল্টো দিকে
ছোট্ট বাজার মতো ছিল কয়েকটা
চালাঘরে দিনে ।র বেলা বাজার বসতো । আসলে ওটা ছিল আমাদেরই , এক সময় খালি
পড়ে থাকা জমি ।
। আমরা ওটাকে
সবসময়ই মাঠ বলে এসেছি ।
এমনকি ওটাকে বাজারের
জন্যে জমা দেবার পরও । শুনেছি
১৯৩৪ শের ভয়ানক ভুমিকম্পে আমাদের বাড়ীর
খুব ক্ষতি হয়েছিল । বাস যোগ্য
ছিলনা বললেই হয় । সেই সময়
ঐ মাঠে খড়ের বাড়ী করে
আমাদের ঠাকুমা সেইখানে নিজের
সংসার তুলে নিয়ে গিয়েছিল ।
ঐ খড়ের বাড়ীতে
আড়াই বছর থেকেছিল সকলে । যত দিন না বাড়ী
ঠিক মতো তৈরি হয় ।ঠাকুমার অবশ্য আর
এই বাড়ীতে ফেরা হয়নি ।খড়ের বাড়ী
থেকেই চলে গিয়েছিল ।
ভূমিকম্প নিয়ে যা
শুনেছি বড়দের মুখে পরে সে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আছে ।
তো ঐ মাঠ পেরিয়ে গিয়ে ডান দিকে বেঁকে গেলে ধোপা পাড়া । ছোট ছোট খাপরার ঘর দু’ধারে ,মাটীর দেওয়াল
দেওয়া । সামনে খানিকটা করে
দাওয়ার মতো । ঘরের সামনে গাধা বাঁধা আছে । বাচ্চারা খেলছে , বড়রা গল্প করছে ।
ওটা পার হলে খানিকটা
ঢালু রাস্তা পার হয়ে যেখানে পড়েছে
, সেটা একটা গোরস্থান
।পাশে একটা ছোট্ট মসজিদ ।
ছোড়দির বাড়ী দেখা যেত ঐখান থেকে ।এটা শর্টকাট। আরেকটা রাস্তা
ছিল এছাড়া ।
ছোড়দির বাড়ী
আমরা ঢুকতাম পেছনের দরজা
দিয়ে , যাকে খিড়কীর দরজা বলা হয়ে
থাকে । বড় গেটটা সচরাচর
বন্ধই থাকতো । একটা বড় মাটীর উঠোন ।
ডান দিকে বড় বড় গাছ ফলের ।
খাপরার চালের বেশ বড়
রান্নাঘর ছিল সোজা গিয়ে সামনে । রান্নাঘরের
আগে বাঁদিকে কয়েকটা
সিঁড়ি উঠে চওড়া দরদালান
তারপর সারি দিয়ে কয়েকটা
ঘর । ঘরের পরে খোলা বারান্দা
তারপর ফুলের বাগান ।
কতো রকম যে ফুল ফুটত । আমার
জ্যাঠামনির যত্নে ।
কতো খেলা করেছি ।
আনন্দ করেছি এই বাড়ীতে । মোট ন’জন ছেলেমেয়ে
ছিল ছোড়দির । নানা বয়েসের । আমার
থেকে দেড় মাসের ছোট খোকন । আমার প্রানের বন্ধু । সাঙ্ঘাতিক
ডানপিটে , খুব ভালো ফুটবল খেলত
, পড়াশোনাতেও ভালো । কিন্তু ধ্যানজ্ঞান
ফুটবল ।
জ্যাঠাইমার মা
,আমাদের দিদিমা থাকতেন ছোড়দির
কাছে । চোখে দেখতে পেতেননা । খোকন রাত্রে শুত
দিদিমার সঙ্গে । একরাতে ঘুমের ঘোরে
গো.........ও...ল করে এমন পা
ছুঁড়ল দিদিমা সোজা মাটিতে । ভাগ্যিস
হাড়গোড় ভাঙেনি । তবে খোকনের
খুব দুর্গতি হয়েছিল ।
জামাইবাবু
কলকাতায় চাকরী করতেন
। মাসে মনে হয় একবার করে
ভাগলপুরে আসতেন । সেই
সময় খোকনের নামে নানা অভিযোগ
হয়তো ওঁর কানে যেত । পড়াশোনা নিয়ে নয় , দুরন্ত পনার । বেগতিক
দেখলেই খোকন আমাদের বাড়ী
পালিয়ে আসতো ।
যখন
বড় হয়েছি আমরা খানিকটা । একটু
একটু গালাগালি শিখেছে
খোকন । আমার সামনে গালাগালি
দিলেই আমি খুব আপত্তি করতাম । ও বলতো “তুই এরকম কাঠখোট্টা
কেন রে ?” আমি বলতাম “ মুখ খারাপ
করলে আমার সামনে আসবিনা তুই ।” কথা শুনত
আমার, সাবধানে কথা
বলতো ।
। ছোড়দির বাড়ীর
উল্টোদিকে তিনটে কুমোরের
চাক ছিল । কুমোরেরা মাটির
খুরি , গ্লাস
বানাতো । অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে
দেখতাম ।
তার পেছনে একটি স্থানীয় মুসলিম
পরিবার থাকতেন । মাস্টারজী আর ভাবী। মাস্টারজী গনেশদার
বন্ধু । নানা উপলক্ষে নেমতন্ন
করে খাওয়াতেন । দারুন
রান্না হতো । ওদের
মেয়ে ইসরত্ ।
আমার থেকে অল্প ছোট । খেলা করতো আমাদের
সঙ্গে ।
মোটাসোটা হাসিমুখ
আমাদের ছোড়দি । কতো ভালবাসেছে । ঐ বাড়ীটা
যেন ছিল সকলের জন্যে । যার যখন খুশী যাচ্ছে ।আসছে । ঐ
বাড়িতেই দাদাদের প্ল্যানচেট
করা । ঐ বাড়িতেই সেই শ্রীকান্তের বাসা
আতাগাছ । যত অনুষ্ঠান
হত ওখানে , মন প্রান খুলে আনন্দ
করেছি ।
দোলের
দিন শেষকালে ছোড়দির
বাড়িতে যেতাম । মাটীর উঠোন জল আর রঙে
পেছল হয়ে থাকতো । ধুম ধাম পিছলে
পড়তাম । তারপর ওইখানে
স্নান করে মাংস ভাত খাওয়া হতো । দরদালানে
লম্বা সারি দিয়ে বসতাম ।
দিদিমা চোখে দেখতে
পেতেননা কিন্তু কাছে বসতেন ।
কারো কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস
করতেন । আরেকটা কথা মনে পড়লো
, মাঝে মাঝে কাছে ডেকে
গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে
দেখতেন ,কতো বড় হলাম । চুল কতো লম্বা হোল ।
নিপুন করে তরিতরকারি
কাটতে পারতেন । খালি কলঘরে
যেতে গেলে কারো সাহায্য লাগতো
একটু সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠে
যেতে হত
। কাউকে হাত ধরে নিয়ে
যেতে হতো ।
জামাইবাবু ভালোমানুষ
, বেশ রসিকও ছিলেন । মানান সই বয়েসের
দাদাদের সঙ্গে ঠাট্টা
ইয়ার্কি করতে শুনেছি ।
ছোড়দির
বড় মেয়ে কলকাতার আশে পাশে কোথাও
পড়াত স্কুলে । বিয়ের বয়স হয়ে গেছে বিয়ে
করতে রাজি নয় ,কিছুতেই । ব্যপারটা সন্দেহজনক ।
পরের মেয়ের বিয়ের কথা ভাবা
যাচ্ছেনা । খালি বলে “ওর বিয়ে দিয়ে দাওনা
! আমি বিয়ে করবোনা ।” মনে আছে একদিন
বিকেলে আমাদের দুর্গাদা ধরে বসলো
“ তাহলে বন্ড
সই কর্, বিয়ে করবিনা বলে ।” তাতে
তো রাজি নয়ই । শেষ অবধি জানা গেল এক প্রফেসর ভদ্রলোককে পছন্দ । ছেলের বাড়ী থেকে অমত । কারণটা আমার জানা নেই । হয়তো
বর্ণ না মেলার কারণ হতে পারে ।
শেষ কালে আমাদের বাড়ী
ছেলের বাড়ী হোল । সে যে কি মজা ।
দারুন ভালো আমাদের জামাই । খুব হাসিখুশি
।
বিয়ের পর বউ নিয়ে বাড়ী গেলে
সবাই মেনে নিয়েছিল বিয়ে। না নেবার
এমনিতে কারণ ছিল না । দেখতে খুব সুন্দর , অনেক গুনও ছিল , বৌয়ের ।
জমজমাট বাড়ী
ছিল আমদের ছোড়দির ।
No comments:
Post a Comment