Saturday, 21 April 2012

ছোড়দির বাড়ী

                                                      ছোড়দির  বাড়ী //
আমাদের  জ্যাঠতুতো  দিদি  ছোড়দির  বাড়ীতে  যে কতো  আনন্দের  মুহুর্ত কাটিয়েছি নিজেরই  হিসেব নেই ।  কতো  দৌরাত্ম্য  করেছি । ফুল  ছিঁড়েছি , গাছে  চড়তে গিয়ে  পড়েছি ।  গাছের ডাল ভেঙেছি । কেউ  কিছু বলেনি কোন দিন ।র বেলা বাজার বসতো ।  আসলে  ওটা ছিল আমাদেরই ,  একসময় খালি
          আমাদের বাড়ীর  উল্টো দিকে  ছোট্ট বাজার  মতো ছিল  কয়েকটা  চালাঘরে দিনে  ।র বেলা বাজার বসতো ।  আসলে  ওটা ছিল আমাদেরই ,   এক সময়  খালি  পড়ে থাকা জমি ।
    ।  আমরা  ওটাকে  সবসময়ই  মাঠ  বলে এসেছি ।  এমনকি  ওটাকে  বাজারের  জন্যে  জমা দেবার পরও ।  শুনেছি  ১৯৩৪ শের ভয়ানক  ভুমিকম্পে আমাদের  বাড়ীর  খুব ক্ষতি  হয়েছিল । বাস যোগ্য ছিলনা  বললেই হয় ।  সেই সময়  ঐ মাঠে   খড়ের  বাড়ী করে  আমাদের  ঠাকুমা  সেইখানে নিজের  সংসার  তুলে নিয়ে গিয়েছিল ।
ঐ  খড়ের বাড়ীতে  আড়াই বছর  থেকেছিল  সকলে । যত দিন না  বাড়ী  ঠিক মতো তৈরি  হয় ।ঠাকুমার  অবশ্য আর  এই বাড়ীতে ফেরা হয়নি ।খড়ের  বাড়ী থেকেই চলে গিয়েছিল ।
ভূমিকম্প নিয়ে  যা  শুনেছি  বড়দের মুখে  পরে সে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আছে ।
  তো ঐ মাঠ পেরিয়ে গিয়ে ডান দিকে  বেঁকে গেলে ধোপা পাড়া ।  ছোট ছোট খাপরার  ঘর দু’ধারে ,মাটীর  দেওয়াল  দেওয়া । সামনে  খানিকটা করে দাওয়ার  মতো ।  ঘরের সামনে  গাধা বাঁধা  আছে ।  বাচ্চারা খেলছে , বড়রা  গল্প করছে ।   ওটা  পার হলে  খানিকটা  ঢালু রাস্তা পার হয়ে  যেখানে পড়েছে , সেটা  একটা  গোরস্থান  ।পাশে  একটা  ছোট্ট মসজিদ ।  ছোড়দির বাড়ী দেখা যেত ঐখান  থেকে ।এটা  শর্টকাট  আরেকটা  রাস্তা  ছিল এছাড়া ।  
           ছোড়দির  বাড়ী  আমরা ঢুকতাম  পেছনের  দরজা  দিয়ে , যাকে  খিড়কীর দরজা  বলা হয়ে  থাকে ।  বড় গেটটা  সচরাচর  বন্ধই  থাকতো ।  একটা বড় মাটীর   উঠোন ।  ডান দিকে  বড় বড় গাছ  ফলের ।  খাপরার   চালের  বেশ  বড় রান্নাঘর  ছিল সোজা গিয়ে সামনে ।   রান্নাঘরের  আগে  বাঁদিকে  কয়েকটা  সিঁড়ি উঠে  চওড়া   দরদালান  তারপর  সারি দিয়ে  কয়েকটা  ঘর ।  ঘরের পরে  খোলা বারান্দা  তারপর  ফুলের  বাগান ।  কতো রকম যে ফুল ফুটত । আমার   জ্যাঠামনির  যত্নে ।
      কতো   খেলা করেছি ।  আনন্দ করেছি এই বাড়ীতে ।   মোট  ন’জন ছেলেমেয়ে  ছিল ছোড়দিরনানা বয়েসের ।  আমার থেকে  দেড় মাসের  ছোট খোকন । আমার  প্রানের বন্ধু ।   সাঙ্ঘাতিক  ডানপিটে ,  খুব ভালো  ফুটবল খেলত  , পড়াশোনাতেও  ভালো । কিন্তু  ধ্যানজ্ঞান  ফুটবল ।
           জ্যাঠাইমার  মা  ,আমাদের   দিদিমা থাকতেন ছোড়দির কাছে । চোখে দেখতে  পেতেননাখোকন  রাত্রে  শুত  দিদিমার সঙ্গে ।   একরাতে   ঘুমের ঘোরে  গো.........ও...ল  করে  এমন  পা ছুঁড়ল দিদিমা  সোজা মাটিতে ।  ভাগ্যিস  হাড়গোড়  ভাঙেনি । তবে  খোকনের  খুব দুর্গতি  হয়েছিল ।
    জামাইবাবু  কলকাতায়  চাকরী  করতেন  । মাসে মনে হয় একবার করে  ভাগলপুরে  আসতেন ।  সেই  সময় খোকনের  নামে  নানা অভিযোগ   হয়তো  ওঁর  কানে যেত ।  পড়াশোনা  নিয়ে নয় , দুরন্ত  পনার ।  বেগতিক  দেখলেই   খোকন  আমাদের বাড়ী  পালিয়ে আসতো ।
     যখন  বড় হয়েছি আমরা খানিকটা ।  একটু একটু  গালাগালি  শিখেছে   খোকন ।  আমার সামনে গালাগালি দিলেই  আমি  খুব আপত্তি করতামও বলতো  “তুই এরকম  কাঠখোট্টা  কেন রে ?” আমি বলতাম “ মুখ খারাপ  করলে  আমার সামনে আসবিনা তুই ।” কথা  শুনত  আমার,  সাবধানে  কথা  বলতো ।
  ।  ছোড়দির বাড়ীর  উল্টোদিকে   তিনটে  কুমোরের  চাক ছিল  । কুমোরেরা   মাটির  খুরি , গ্লাস   বানাতো ।  অনেকক্ষণ  দাঁড়িয়ে  দেখতাম ।
     তার পেছনে একটি স্থানীয়  মুসলিম   পরিবার  থাকতেন । মাস্টারজী আর ভাবীমাস্টারজী  গনেশদার  বন্ধু ।  নানা উপলক্ষে  নেমতন্ন  করে  খাওয়াতেন ।  দারুন  রান্না  হতো ।  ওদের  মেয়ে   ইসরত্‌ ।  আমার থেকে অল্প ছোট খেলা করতো  আমাদের সঙ্গে ।
          মোটাসোটা  হাসিমুখ  আমাদের  ছোড়দি ।  কতো ভালবাসেছে ।  ঐ বাড়ীটা  যেন  ছিল সকলের জন্যে ।  যার যখন খুশী যাচ্ছে ।আসছে ।  ঐ  বাড়িতেই  দাদাদের  প্ল্যানচেট  করা । ঐ বাড়িতেই  সেই   শ্রীকান্তের    বাসা  আতাগাছ ।   যত  অনুষ্ঠান  হত  ওখানে , মন প্রান খুলে  আনন্দ  করেছি ।
           দোলের  দিন  শেষকালে  ছোড়দির  বাড়িতে  যেতাম  । মাটীর উঠোন জল আর  রঙে  পেছল হয়ে থাকতো ।  ধুম ধাম  পিছলে  পড়তাম ।  তারপর  ওইখানে  স্নান করে মাংস ভাত  খাওয়া হতো ।  দরদালানে   লম্বা  সারি দিয়ে  বসতাম ।  দিদিমা  চোখে  দেখতে   পেতেননা কিন্তু  কাছে  বসতেন ।  কারো কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস  করতেন । আরেকটা  কথা মনে পড়লো ,  মাঝে মাঝে  কাছে ডেকে  গায়ে  মাথায়  হাত বুলিয়ে  দেখতেন ,কতো বড় হলাম ।  চুল  কতো লম্বা হোল ।
                নিপুন  করে তরিতরকারি  কাটতে পারতেন ।  খালি   কলঘরে  যেতে   গেলে কারো সাহায্য  লাগতো   একটু  সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠে যেতে  হত  ।  কাউকে  হাত ধরে নিয়ে  যেতে হতো ।
      জামাইবাবু   ভালোমানুষ  ,   বেশ রসিকও  ছিলেন । মানান সই  বয়েসের  দাদাদের  সঙ্গে  ঠাট্টা  ইয়ার্কি  করতে   শুনেছি ।
         ছোড়দির  বড় মেয়ে  কলকাতার আশে পাশে কোথাও পড়াত স্কুলে ।  বিয়ের বয়স হয়ে গেছে বিয়ে করতে রাজি নয় ,কিছুতেই ।  ব্যপারটা  সন্দেহজনক ।  পরের মেয়ের বিয়ের কথা  ভাবা যাচ্ছেনা । খালি  বলে “ওর বিয়ে দিয়ে দাওনা !  আমি বিয়ে করবোনা ।” মনে আছে  একদিন  বিকেলে  আমাদের দুর্গাদা   ধরে বসলো  “  তাহলে  বন্ড  সই কর্‌, বিয়ে করবিনা বলে ।”  তাতে তো রাজি নয়ই ।  শেষ অবধি জানা গেল  এক প্রফেসর ভদ্রলোককে  পছন্দ । ছেলের বাড়ী থেকে অমত ।  কারণটা আমার জানা নেই ।  হয়তো   বর্ণ না মেলার  কারণ হতে পারে ।
                     শেষ কালে  আমাদের বাড়ী  ছেলের বাড়ী হোল ।  সে যে কি মজা । দারুন  ভালো আমাদের জামাই । খুব হাসিখুশি । 
                 বিয়ের পর বউ নিয়ে   বাড়ী গেলে  সবাই মেনে নিয়েছিল বিয়ে। না নেবার  এমনিতে কারণ ছিল না । দেখতে খুব সুন্দর , অনেক গুনও ছিল ,  বৌয়ের ।
         জমজমাট  বাড়ী  ছিল  আমদের  ছোড়দির ।

No comments:

Post a Comment