Saturday, 21 April 2012

আমার বাবা ।


( বাবা,  হাতে করে   কখনও  কিছু  দিতে পারিনি তোমায় ।সুযোগ হয়নি   একটা  প্রণামও  করিনি হয়তো  কখনও  ,অথচ  সারা জীবন ধরে যা কিছু  পেয়েছি ,  সব কিছু  তোমাদের  দুজনেরই দান । জানিনা  পরপারে কি আছে । ভাবতে  ইচ্ছে করে   তোমাদের  সঙ্গে দেখা হবে আবার !  আমার  প্রনাম নিও বাবা ।)
            আমাদের  বাবা  যখন আমাদের রেখে চলে যায়   তখন  আমার বয়স  পাঁচ বছর হতে  কয়েক মাস  বাকি ।   দিদি সতের , দাদা তের , ছোড়দি আট । আর  আমাদের মা চৌত্রিশ !
       এক রাতে কোথাও কিছু নেই । কলকাতা  থেকে  আত্মীয় স্বজন এসেছিলেন  তাঁদের রাত্রের  ট্রেনে  তুলে দিয়ে এসে  খাওয়া  দাওয়া  সেরে   হাঁটাহাঁটি  করতে করতে  পড়ে গেল ।      তখনও  নীচের  ডিসপেনসারিতে  আমাদের  ডাক্তার দাদা গনেশদা  উপস্থিতদৌড়ে  ওপরে  এলো  , উল্টো  দিকে  সেজ জ্যাঠাবাবুর  বাড়ী  থেকে  এলো  কাতুদা ,এলেন  শহরের  আরও  ডাক্তার বাবুরা ।   যাযা   করণীয়  সমস্ত কিছু করার   সত্ত্বেও কিছুই হলনা ।

         যে এসেছিল  সে  খালি হাতে ফিরে  যাবে বলে আসেনি ।  নির্মমতার  পরীক্ষায়  তার  পুরো মার্কস   দরকার ছিল তাই  , বিছানায়  দুটি  ঘুমন্ত  শিশু , দিশাহারা  অসহায়  এক  স্ত্রী  সবাইয়ে দিকে  তাচ্ছিল্যের  দৃষ্টিপাত  করে ,  মুল্যবান  প্রাণটি  হাতের  মুঠোয়  পুরে  মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল ।
       কাজেই  সকলে  বুঝতেই  পারবেন  ,বাবার  স্মৃতি  আমার  খুব  বেশী নেই ।  তবু   আশ্চর্য জনক  ভাবে  মনে আছে  কিছু ঘটনা ।
      যেমন  দিদির  বিয়ের সময়  আমার  বয়স ছিল দুই ।  অথচ  দিদির বিয়ের  পরদিন  বরকনে  বিদায়ের  সময়   যখন  সবাই  আশীর্বাদ করে ,   পিসিমার ঘরে ব্যবস্থা  হয়েছিল আমার পরিস্কার  মনে আছে  বাবা  একদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে  আশীর্বাদ  করে অন্য দরজা দিয়ে  বেরিয়ে গিয়েছিল ।
        মাত্র চৌদ্দ বছর  বয়েসে  বিয়ে হয়েছিল  দিদির । জামাইবাবু  ডাক্তারি  পড়ছেন তখন ।  দিদি  মামার  বাড়ীতে  ছিল  ।একদিন দিদির  শ্বশুরমশাইএর  চোখ  পড়লো   সুন্দরী  মেয়েটির  ওপর ।তিনি তাকে  ছেলের বউ করার জন্যে  প্রস্তাব করলেন । মার প্রবল আপত্তি  সত্ত্বেও বিয়ে হয়ে গেল । অবশ্য বিয়ের  পরে  দিদি পড়াশোনা করেছে , চাকরী করেছে ।    
এক সময়  আমার  মনে প্রশ্ন  উঠেছিল  কেন বাবা  এতো অল্প বয়েসে  বিয়ে দিল দিদির  বেশ  ক্ষুব্ধও  হয়েছি ।  পরে নিজেই  বুঝতে পেরেছিলাম  , নিজের   স্বাস্থের  ওপর  ভরসা ছিলনা  বাবার । হার্ট   ভালো ছিলনা । একটা  দায়িত্ব  থেকে  মাকে  মুক্ত করে দিতে চেয়েছিল  হয়তো !
      নানান  গুন ছিল দিদির ।  পরে হয়তো  দিদিকে নিয়ে একটু  লিখব । কখনও ঘোর সংসারী  কখনও  ঘোর  উদসীন  এক  অদ্ভুত  চরিত্র ।  দু একটা  গুনের কথা বলি খুব ভালো গান করতো ।  আমরা  যত গান শিখেছি  সব দিদির কাছে । আবার হয়তো দেখা গেল  একতাল মাটি হাতে নিয়ে  নাড়া চাড়া   করছে । আস্তে আস্তে  দেখা গেল , সেই মাটির  তাল থেকে  তৈরী হোল একটা  বুড়ী   ,মাথার ঝুড়ি   নামাচ্ছে  একটা ভাঙা পাঁচিলের ওপর  বা  একটি স্বাস্থবতী  মেয়ে  এক পা ছড়িয়ে  বসে  চুলে চিরুনি চালাচ্ছে ।  এই রকম আরও ।
         ওকালতি  পাস করেছিল বাবাকিছুদিন  প্র্যাকটিস করার  পর  “ বড্ড  মিথ্যে  কথা  বলতে হয়” বলে ছেড়ে  দিল ।  শুরু করলো   স্পোর্টিং গুড্‌স  সাপ্লাইএর ব্যবসা ।  বিহারের  বিভিন্ন  স্কুল কলেজে  খেলার   সরঞ্জাম  পাঠানো হতো । বাড়ীর ছোটদের   সঙ্গে  বাবার  বেশ ভালো সম্পর্ক   ছিল মনে আছে  হাতে এক গোছা  না    ফোলান  লম্বা বেলুন    একটা  সাইকেলে হাওয়া  ভরার পাম্প  দিয়ে ভরে ভরে বাড়ীর ছোটদের  হাতে  দিচ্ছে ।
    আমার  সঙ্গে  কিছু কিছু  খেলা  ছিল বাবার ।   আমাদের ভেতর বাড়ীতে  ঢুকেই  একটা  লম্বা  বারান্দা  পার  হয়ে  ঠাকুর ঘর ।  দুপুরে বাবার  আসার সময়  হলে  আমি ঠাকুর ঘরের  দরজার  কাছে গুটিসুটি  হয়ে  বসে থাকতাম ।  বাবা সোজা  এসে আমার  সঙ্গে   ধাক্কা খেত , আমি  কিলবিল করে উঠলে  বলতো  “এখানে  কেউ  আছে  বুঝি ?  দেখতে  পাইনি তো !” তারপর  কোলে  নিত।    
        সব  ভাইয়েরা  এক সঙ্গে  খেতে বলতো ।মাটিতে  আসন   পেতে  পিসিমা  বসতো  হাতে পাখা নিয়ে ।  আমি  বাবাদের  পিঠের দিক দিয়ে  আসা যাওয়া করতাম ।  বাবার  কাছে  এলেই  বাবা  দেওয়ালের  সঙ্গে  চেপে  ধরত ।  আমি সেইটাই  চাইতাম ।  এখন ভাবি  কতো বিরক্ত করেছি ।
      সেজজ্যাঠাবাবুর  ছেলে  বুড়োদা  হিন্দুমহাসভার  সদস্য ছিল । গান্ধীজী  হত্যার পর দলের  সমস্ত  সদস্যকে   সরকার  গ্রেফতার করে ।  বুড়োদাও ছিল তার মধ্যে । আমার মা আর বাবা  দুজনেরই  খুব প্রিয় ছিল বুড়োদা ।   সেজজ্যাঠাবাবু  অসুস্থ । এরমধ্যে  খবর  এলো জেলে   কিছু কয়েদিকে  গুলি করা  হয়েছে । বাবা   সাংঘাতিক  উদ্বিগ্ন ।  সারা দিন  জেলখানায় গিয়ে বসে আছে । শেষ পর্যন্ত  অনেক ভাবে  বুঝিয়ে আশ্বস্ত করে  ফেরত   পাঠাতে  পারা গিয়েছিল ।
        যেদিন  চলে গেল । রাতে  রোজকার  মতো নিশ্চিন্তে  ঘুমিয়েছি ।  ভোর  রাতে  কেউ  কোলে তুলে নিল ।  আধো ঘুমে  দেখলাম , মাটীতে  বাবা  শুয়ে আছে । মাথার  দিকে  ছোটকাকিমা ,  পায়ের দিকে মা বসে । ঘরে অনেক  লোক ।  দরজার  বাঁ দিকের  চৌকাঠে  মাথা  ঠেকিয়ে সর্বহারার  মতো  বসে      সর্ব্বংসহা  , স্থিতধি  আমাদের  পিসিমা ।
        যে কোলে করে  নিয়ে গিয়েছিল  সে আমাদের  দুই বোনকে  ছোট কাকীমার  উঁচু  খাটে  শুইয়ে  দিয়েছিল । আবার  ঘুমিয়ে পড়েছিলাম   একটু বেলায়  আমাদের  জ্যাঠতুত দিদি  ছোড়দির  বাড়ী  পৌঁছে দিয়েছিল  কেউ ।  সারাদিন  ওখানেই  ছিলাম ।  ছোড়দির  ছেলে মেয়েরা   কেউ কেউ আমাদের  বয়সী । কেউ খানিক বড় ।  ওদেরই   তত্ত্বাবধান এ  ছিলাম । আমার  ছোড়দি  বাবার  বিষয়ে  প্রশ্ন  করেছিল ।  ওরা  সবাই  একযোগে  বলেছিল  “নতুনদাদুর  শরীর  খারাপ ,  তাই হাসপাতালে  নিয়ে গেছে ।“
         কি আশ্চর্য্য !  কেউ মুখ     খোলেনি ।  কতদিন  পর্যন্ত  ভাবতাম  বাবা  সেরে গিয়ে  হাসপাতাল  থেকে  ফিরে আসবে ।   আসেনি আর ।


No comments:

Post a Comment