( বাবা, হাতে করে
কখনও কিছু দিতে পারিনি তোমায় ।সুযোগ হয়নি । একটা প্রণামও করিনি হয়তো
কখনও ,অথচ সারা জীবন ধরে যা কিছু পেয়েছি , সব কিছু
তোমাদের দুজনেরই দান । জানিনা পরপারে কি আছে । ভাবতে ইচ্ছে করে
তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে আবার
! আমার
প্রনাম নিও বাবা ।)
আমাদের বাবা
যখন আমাদের রেখে চলে যায় তখন আমার বয়স
পাঁচ বছর হতে কয়েক মাস বাকি ।
দিদি সতের , দাদা তের , ছোড়দি আট । আর
আমাদের মা চৌত্রিশ !
এক রাতে কোথাও কিছু নেই । কলকাতা থেকে
আত্মীয় স্বজন এসেছিলেন তাঁদের
রাত্রের ট্রেনে তুলে দিয়ে এসে
খাওয়া দাওয়া সেরে হাঁটাহাঁটি করতে করতে
পড়ে গেল । তখনও
নীচের ডিসপেনসারিতে আমাদের
ডাক্তার দাদা গনেশদা উপস্থিত ।দৌড়ে ওপরে এলো , উল্টো
দিকে সেজ জ্যাঠাবাবুর বাড়ী
থেকে এলো কাতুদা ,এলেন
শহরের আরও ডাক্তার বাবুরা । যাযা
করণীয় সমস্ত কিছু করার সত্ত্বেও কিছুই হলনা ।
যে এসেছিল সে
খালি হাতে ফিরে যাবে বলে আসেনি
। নির্মমতার পরীক্ষায়
তার পুরো মার্কস দরকার ছিল তাই , বিছানায়
দুটি ঘুমন্ত শিশু , দিশাহারা অসহায়
এক স্ত্রী সবাইয়ে দিকে
তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিপাত করে , মুল্যবান প্রাণটি
হাতের মুঠোয় পুরে
মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল ।
কাজেই
সকলে বুঝতেই পারবেন
,বাবার স্মৃতি আমার
খুব বেশী নেই । তবু
আশ্চর্য জনক ভাবে মনে আছে
কিছু ঘটনা ।
যেমন
দিদির বিয়ের সময় আমার
বয়স ছিল দুই । অথচ দিদির বিয়ের
পরদিন বরকনে বিদায়ের
সময় যখন সবাই
আশীর্বাদ করে , পিসিমার ঘরে
ব্যবস্থা হয়েছিল ।আমার
পরিস্কার মনে আছে বাবা
একদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে
আশীর্বাদ করে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল ।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়েসে
বিয়ে হয়েছিল দিদির ।
জামাইবাবু ডাক্তারি পড়ছেন তখন ।
দিদি মামার বাড়ীতে
ছিল ।একদিন দিদির শ্বশুরমশাইএর
চোখ পড়লো সুন্দরী
মেয়েটির ওপর ।তিনি তাকে ছেলের বউ করার জন্যে প্রস্তাব করলেন । মা’র প্রবল আপত্তি
সত্ত্বেও বিয়ে হয়ে গেল । অবশ্য বিয়ের পরে
দিদি পড়াশোনা করেছে , চাকরী করেছে ।
এক সময় আমার
মনে প্রশ্ন উঠেছিল কেন বাবা
এতো অল্প বয়েসে বিয়ে দিল দিদির ।বেশ ক্ষুব্ধও হয়েছি । পরে নিজেই
বুঝতে পেরেছিলাম , নিজের স্বাস্থের
ওপর ভরসা ছিলনা বাবার । হার্ট ভালো ছিলনা । একটা দায়িত্ব
থেকে মাকে মুক্ত করে দিতে চেয়েছিল হয়তো !
নানান
গুন ছিল দিদির । পরে হয়তো দিদিকে নিয়ে একটু লিখব । কখনও ঘোর সংসারী কখনও
ঘোর উদসীন এক
অদ্ভুত চরিত্র । দু একটা
গুনের কথা বলি । খুব ভালো গান করতো ।
আমরা যত গান শিখেছি সব দিদির কাছে । আবার হয়তো দেখা গেল একতাল মাটি হাতে নিয়ে নাড়া চাড়া
করছে । আস্তে আস্তে দেখা গেল , সেই
মাটির তাল থেকে তৈরী হোল একটা
বুড়ী ,মাথার ঝুড়ি
নামাচ্ছে একটা ভাঙা পাঁচিলের ওপর বা
একটি স্বাস্থবতী মেয়ে এক পা ছড়িয়ে
বসে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে । এই রকম আরও ।
ওকালতি
পাস করেছিল বাবা ।কিছুদিন প্র্যাকটিস
করার পর
“ বড্ড মিথ্যে কথা
বলতে হয়” বলে ছেড়ে দিল । শুরু করলো
স্পোর্টিং গুড্স সাপ্লাইএর ব্যবসা
। বিহারের বিভিন্ন
স্কুল কলেজে খেলার সরঞ্জাম
পাঠানো হতো । বাড়ীর ছোটদের
সঙ্গে বাবার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল । মনে আছে হাতে এক গোছা
না ফোলান লম্বা বেলুন । একটা
সাইকেলে হাওয়া ভরার পাম্প দিয়ে ভরে ভরে বাড়ীর ছোটদের হাতে
দিচ্ছে ।
আমার
সঙ্গে কিছু কিছু খেলা
ছিল বাবার । আমাদের ভেতর
বাড়ীতে ঢুকেই একটা
লম্বা বারান্দা পার
হয়ে ঠাকুর ঘর । দুপুরে বাবার
আসার সময় হলে আমি ঠাকুর ঘরের দরজার
কাছে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকতাম ।
বাবা সোজা এসে আমার সঙ্গে
ধাক্কা খেত , আমি কিলবিল করে
উঠলে বলতো “এখানে
কেউ আছে বুঝি ?
দেখতে পাইনি তো !” তারপর কোলে
নিত।
সব
ভাইয়েরা এক সঙ্গে খেতে বলতো ।মাটিতে আসন
পেতে । পিসিমা বসতো
হাতে পাখা নিয়ে । আমি বাবাদের
পিঠের দিক দিয়ে আসা যাওয়া করতাম
। বাবার
কাছে এলেই বাবা দেওয়ালের
সঙ্গে চেপে ধরত ।
আমি সেইটাই চাইতাম । এখন ভাবি
কতো বিরক্ত করেছি ।
সেজজ্যাঠাবাবুর ছেলে
বুড়োদা হিন্দুমহাসভার সদস্য ছিল । গান্ধীজী হত্যার পর দলের সমস্ত
সদস্যকে সরকার গ্রেফতার করে । বুড়োদাও ছিল তার মধ্যে । আমার মা আর বাবা দুজনেরই
খুব প্রিয় ছিল বুড়োদা । সেজজ্যাঠাবাবু
অসুস্থ । এরমধ্যে খবর এলো জেলে
কিছু কয়েদিকে গুলি করা হয়েছে । বাবা
সাংঘাতিক উদ্বিগ্ন । সারা দিন
জেলখানায় গিয়ে বসে আছে । শেষ পর্যন্ত
অনেক ভাবে বুঝিয়ে আশ্বস্ত করে ফেরত
পাঠাতে পারা গিয়েছিল ।
যেদিন
চলে গেল । রাতে রোজকার মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি ।
ভোর রাতে কেউ
কোলে তুলে নিল । আধো ঘুমে দেখলাম , মাটীতে বাবা
শুয়ে আছে । মাথার দিকে ছোটকাকিমা ,
পায়ের দিকে মা বসে । ঘরে অনেক লোক
। দরজার
বাঁ দিকের চৌকাঠে মাথা
ঠেকিয়ে সর্বহারার মতো বসে সর্ব্বংসহা
, স্থিতধি আমাদের পিসিমা ।
যে কোলে করে নিয়ে গিয়েছিল
সে আমাদের দুই বোনকে ছোট কাকীমার
উঁচু খাটে শুইয়ে
দিয়েছিল । আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । একটু বেলায় আমাদের
জ্যাঠতুত দিদি ছোড়দির বাড়ী
পৌঁছে দিয়েছিল কেউ । সারাদিন
ওখানেই ছিলাম । ছোড়দির
ছেলে মেয়েরা কেউ কেউ আমাদের বয়সী । কেউ খানিক বড় । ওদেরই
তত্ত্বাবধান এ ছিলাম । আমার ছোড়দি
বাবার বিষয়ে প্রশ্ন
করেছিল । ওরা সবাই
একযোগে বলেছিল “নতুনদাদুর
শরীর খারাপ , তাই হাসপাতালে
নিয়ে গেছে ।“
কি আশ্চর্য্য ! কেউ মুখ
খোলেনি । কতদিন পর্যন্ত
ভাবতাম বাবা সেরে গিয়ে
হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবে ।
আসেনি আর ।
No comments:
Post a Comment