Saturday, 21 April 2012

সেজজ্যাঠাবাবু //

         সেজজ্যাঠাবাবু  ছিল মেজজাঠাবাবুর  একেবারে বিপরীত ।  দারুন দাপুটে , প্রভাবশালী , নামকরা ডাক্তার । আশপাশের  শহর এমনকি পাটনা  থেকেও  রোগী আসত  বলে শুনেছি। কংগ্রেস করতো ।শুনেছি  ছেচল্লিশ  সালের দাঙ্গার  সময়  জাতি ধর্ম  নির্বিশেষ  অনেক মানুষকে  রেস্কিউ করে নিরাপদ জায়গায়  রেখেছিল । একটা জীপ ছিল । ওটাতে  করে ঘুরে ঘুরে  চারিদিক  সামাল দিয়ে  বেড়িয়েছিল ।

             আমার অবশ্য যখন থেকে মনে আছে  তখন আর এসব কিছুই করার মতো অবস্থায় ছিলোনা । পক্ষাঘাত হয়েছিল । প্রথম যখন মনে পড়ে  হাতে লাঠি নিয়ে একটু পা টেনে হাঁটতো । তারপর  আস্তে আস্তে সেটাও  আর পারতনা । সমস্ত কিছুর জন্যেই  কারো সাহায্য লাগতো । তবে তখন যে কথা বলতো আমরা সবাই বুঝতে পারতাম যদিও  কিছুটা  জড়িয়ে  গিয়েছিল  কথা ।   আমাকে বলতো  “তোর নাম মৎস্যগন্ধা ,আর কেয়ার নাম মধুছন্দা । কেয়া সেজজ্যাঠাবাবুর  মেয়ে ,আমার  উনিশদিনের ছোট বোন ।   নামটা আমার মোটেই পছন্দ হতোনা ।যদিও  মৎস্যগন্ধার  সত্যবতী  হওয়ার গল্প জানতাম ।আমদের মা আমদের  অসুখ বিসুখ করলেই  হয় মহাভারতের গল্প বলতো নাহলে  চয়নিকা থেকে  কবিতা  পড়ে  শোনাত ।  তবু  নামটা বিচ্ছিরি লাগতো ।  জোরে জোরে  প্রতিবাদ করতাম । সেজজ্যঠাবাবু হাসত ।

           আগেকার দিনের  বিরাট  একটা  ডবল হাতল ওয়ালা  আরামকেদারা  ছিল যেটাতে  আধশোয়া  হয়ে   থাকতো  সেজজ্যাঠাবাবু  প্রায় সারাদিন ।  আরও একটা একদম ঐ রকম ছিল  আমাদের বাড়ীতেও । একটা  টানা রিক্সাছিল এক বুড়ো রিক্সাওয়ালার ।সে  রোজ সেজজ্যাঠাবাবুকে   ওবাড়ী থেকে এবাড়ী নিয়ে আসতো । দুপুর বেলা  খাওয়ার সময় ।  দুপুরের   ভাত  পিসিমার  হাতে খেত । রাতে  সেজজ্যাঠাইমা   খাইয়ে দিত ।  যদিওএকই  রাস্তার এপারে ওপারে  বাড়ী  তবু এছাড়া  আসার বোধহয়  অন্য কোন  উপায়  পাওয়া যায়নি ।  সঙ্গে  কেউ একজন থাকতো ।

      ওবাড়ী  থেকে  ঠাকুর   সেজজ্যাঠাবাবুর  খাবার  এবাড়ীতে  পৌঁছে দিয়ে যেত ।   একটুখানি  সুগন্ধ ওয়ালা আতপ চালের  ভাত , সঙ্গে হালকা  রান্না । পিসিমা  ভাইয়ের বুকের ওপর  সাদা তোয়ালে  পেতে  একটু একটু করে খাইয়ে দিত ।  আমি মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়াতাম । খুব ভালো লাগতো  অমন যত্ন করে খাওয়ান দেখতে । সেজজ্যাঠাইমাও খুব যত্ন  করে  খাওয়াতো । যেন একটা শিশু ।
              সেজজ্যাঠাবাবুর   কথা  পরের দিকে একদম জড়িয়ে  গিয়েছিল ।  আমরা বুঝতে পারতামনা  কি বলছে ।  কেউ কেউ বুঝত । পিসিমা বুঝতে পারত ।  মাঝে মাঝে  কারো ওপর কোন কারণে  অভিমান  হলে  কান্না কাটি করতে দেখেছি পিসিমার কাছে । তার সঙ্গে  কিছু বলতোও ।  পিসিমা ঠিক বুঝত । বোঝাতো ভাইকে । একটা ঘটনা  মনে পড়ে  আমাদের  কাতুদা ডাক্তার মানুষ । একটু বেশীরকম  অন্যমনস্ক ।  কোনদিন  বোধহয়  সেজজ্যাঠাবাবুর  সামনে দিয়ে  সিগারেট খেতে খেতে বেরিয়ে গেছে । কাতুকাকে যারা চেনে  সবাই বুঝবে কাতুদা বাবাকে লক্ষ্যই  করেনি কিন্তু  সেজজ্যাঠাবাবুর মনে হয়েছে ছেলে আর বাবাকে গ্রাহ্য করেনা । পিসিমাকে  সেদিন  ভাইকে  শান্ত  করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল ।

        সেজজ্যাঠাবাবু  রাতের দিকে মারা  গিয়েছিল   খুব ভোরে  ও বাড়ী থেকে  বাড়ী এসে  পিসিমার  সঙ্গে প্রথম দেখা  মুখ থমথমে ।  দেখলেই  বোঝাযায়  ঝড় চলছে ভেতরে   খুব স্বাভাবিক  ভাবে জিজ্ঞেস করলো   “নিয়ে গেছে ?”

      অদ্ভুত বাঁধন ছিল ভাই বোনের মধ্যে ।
     

No comments:

Post a Comment