আমার অবশ্য যখন থেকে মনে আছে তখন আর এসব কিছুই করার মতো অবস্থায় ছিলোনা । পক্ষাঘাত হয়েছিল । প্রথম যখন মনে পড়ে হাতে লাঠি নিয়ে একটু পা টেনে হাঁটতো । তারপর আস্তে আস্তে সেটাও আর পারতনা । সমস্ত কিছুর জন্যেই কারো সাহায্য লাগতো । তবে তখন যে কথা বলতো আমরা সবাই বুঝতে পারতাম যদিও কিছুটা জড়িয়ে গিয়েছিল কথা । আমাকে বলতো “তোর নাম মৎস্যগন্ধা ,আর কেয়ার নাম মধুছন্দা । ” কেয়া সেজজ্যাঠাবাবুর মেয়ে ,আমার উনিশদিনের ছোট বোন । নামটা আমার মোটেই পছন্দ হতোনা ।যদিও মৎস্যগন্ধার সত্যবতী হওয়ার গল্প জানতাম ।আমদের মা আমদের অসুখ বিসুখ করলেই হয় মহাভারতের গল্প বলতো নাহলে চয়নিকা থেকে কবিতা পড়ে শোনাত । তবু নামটা বিচ্ছিরি লাগতো । জোরে জোরে প্রতিবাদ করতাম । সেজজ্যঠাবাবু হাসত ।
আগেকার দিনের বিরাট একটা ডবল হাতল ওয়ালা আরামকেদারা ছিল যেটাতে আধশোয়া হয়ে থাকতো সেজজ্যাঠাবাবু প্রায় সারাদিন । আরও একটা একদম ঐ রকম ছিল আমাদের বাড়ীতেও । একটা টানা রিক্সাছিল এক বুড়ো রিক্সাওয়ালার ।সে রোজ সেজজ্যাঠাবাবুকে ওবাড়ী থেকে এবাড়ী নিয়ে আসতো । দুপুর বেলা খাওয়ার সময় । দুপুরের ভাত পিসিমার হাতে খেত । রাতে সেজজ্যাঠাইমা খাইয়ে দিত । যদিওএকই রাস্তার এপারে ওপারে বাড়ী তবু এছাড়া আসার বোধহয় অন্য কোন উপায় পাওয়া যায়নি । সঙ্গে কেউ একজন থাকতো ।
ওবাড়ী থেকে ঠাকুর সেজজ্যাঠাবাবুর খাবার এবাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে যেত । একটুখানি সুগন্ধ ওয়ালা আতপ চালের ভাত , সঙ্গে হালকা রান্না । পিসিমা ভাইয়ের বুকের ওপর সাদা তোয়ালে পেতে একটু একটু করে খাইয়ে দিত । আমি মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়াতাম । খুব ভালো লাগতো অমন যত্ন করে খাওয়ান দেখতে । সেজজ্যাঠাইমাও খুব যত্ন করে খাওয়াতো । যেন একটা শিশু ।
সেজজ্যাঠাবাবুর কথা পরের দিকে একদম জড়িয়ে গিয়েছিল । আমরা বুঝতে পারতামনা কি বলছে । কেউ কেউ বুঝত । পিসিমা বুঝতে পারত । মাঝে মাঝে কারো ওপর কোন কারণে অভিমান হলে কান্না কাটি করতে দেখেছি পিসিমার কাছে । তার সঙ্গে কিছু বলতোও । পিসিমা ঠিক বুঝত । বোঝাতো ভাইকে । একটা ঘটনা মনে পড়ে আমাদের কাতুদা ডাক্তার মানুষ । একটু বেশীরকম অন্যমনস্ক । কোনদিন বোধহয় সেজজ্যাঠাবাবুর সামনে দিয়ে সিগারেট খেতে খেতে বেরিয়ে গেছে । কাতুকাকে যারা চেনে সবাই বুঝবে কাতুদা বাবাকে লক্ষ্যই করেনি কিন্তু সেজজ্যাঠাবাবুর মনে হয়েছে ছেলে আর বাবাকে গ্রাহ্য করেনা । পিসিমাকে সেদিন ভাইকে শান্ত করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল ।
সেজজ্যাঠাবাবু রাতের দিকে মারা গিয়েছিল ।খুব ভোরে ও বাড়ী থেকে বাড়ী এসে পিসিমার সঙ্গে প্রথম দেখা মুখ থমথমে । দেখলেই বোঝাযায় ঝড় চলছে ভেতরে । খুব স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলো “নিয়ে গেছে ?”
অদ্ভুত বাঁধন ছিল ভাই বোনের মধ্যে ।
No comments:
Post a Comment