Friday, 20 April 2012

         মেজজ্যাঠাবাবু ।।

             মেজজ্যাঠাবাবু  ডাক্তারি পাস করেছিল ,  কিন্তু  আমার যখন থেকে মনে পড়ে  বাড়ীর পোষাকেই দেখেছি । ডাক্তারি করতে দেখিনি কখনও ।  এক পিসিমা ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলতেও দেখিনি । বাড়ীর পোষা  পাখী , পশুদের সঙ্গে বলত কথা । সারাক্ষন বই পত্রে মুখ গুঁজে থাকতো  আর  মাঝে মাঝে  বিকেলের দিকে  গান গাইত কখনো  বারান্দায় ঘুরে ঘুরে , কখনও  বা পিসিমার ঘরে বসে হারমনিয়াম  বাজিয়ে ।  একটা গান  খুব প্রিয় ছিল “ জাগরণে যায় বিভাবরী / আঁখি  হতে ঘুম নিলো হরি/ /”  দরাজ গলা একটু কর্কশ , কিন্তু নির্ভুল  সুর , তাল ।  সমে   এসেই  নিজের  পশ্চাৎ দেশে  এক প্রবল  থাপ্পড় মারত ।             
             মনে আছে একবার  আমার  ডান হাতের আঙুলে  একটা কাঁটা  ফুটে  জায়গাটা পেকে উঠে খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম , নানা রকম চেষ্টা করে যখন কোন লাভ হলনা ,তখন ঠিক হল জায়গাটা  একটু কেটে ভেতর থেকে  পূঁজ রক্ত বের করে দেওয়া হবে ।  তো সেই মত আমাদের দুর্গা দা, যে আমাদের ডিসপেনসারিতে  খুব অল্প বয়সে  কম্পাউন্ডার হয়ে ঢুকে  বহু বছর  কাজ করে আমাদের বাড়ীর একজন হয়ে গিয়েছিল ,  মুখের কাছটা একটু বেঁকানো  ছোট একটা ছুরি আর তুলো , ওষুধপত্র ইত্যাদি নিয়ে এসে  বসলো ।
                    কাছে বসেছিল মেজ্‌জ্যঠাবাবু , কি মনে করে  দুর্গাদার  হাত থেকে ছুরিটা চেয়ে নিল দুর্গাদা একটু দ্বিধা করে ভালো করে   স্পিরিট  দিয়ে আমার আঙুল আর ছুরিটা  মুছে  মেজ্‌জ্যাঠাবাবুর  হাতে দিল ।  মেজ্‌জ্যাঠাবাবু   মুহুর্তের  মধ্যে আঙুলের  ঠিক জায়গাটা  একটু চিরে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো “কি রে লাগলো ?”  আমি এতো অবাক হয়ে গেলাম যে কিছু বলতেই পারলামনা ।  দুর্গাদা বাকি কাজটুকু  করে দিল ।
                  পিসিমার  হাই ব্লাডপ্রেশার  ছিল । শুধু  ওষুধে  কমতনা সব সময়,  তখন কিছু রক্ত বের করে দিতে হতো । এই নিয়ম আগেকার দিনে ছিল অনেকে হয়তো জানেন । পিসিমা  ঠাকুর ঘরের সামনের বারান্দায় শুত , দুর্গাদা   ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ , কিডনি বোল , সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে রক্ত বার করতে বসতো ।মেজ্‌জ্যাঠাবাবু  যেখানেই  থাক এসে পিসিমার নাড়ি ধরে বসতো ।
           মেজ্‌জ্যাঠাবাবুরা পরের দিকে খুব কাছেই  একটা বাড়ী কিনে চলেগেছিল  । খুব সুন্দর বাড়ী ,এক সাহেবের থেকে  কেনা । তবে মেজ্‌জ্যাঠাবাবু  সারাদিন  এবাড়িতেই থাকতো ।  কখনও কখনও   হয়তো  ঐ বাড়ী গেল ।
           কদিন থাকার পর মেজ্‌জ্যাঠাইমা  কাউকে দিয়ে পিসিমাকে খবর  পাঠাল দুদিন ধরে  কিছু খাচ্ছেনা ,এখানে এসে থাকলে  না খাইয়ে যেন   ছাড়া  না হয় ।  পিসিমা  ভাইকে  ডেকে  বলল দুপুরে না খেয়ে  যেন না যায় । ভাইয়ের  সাধ্য ছিলনা  আদেশ অমান্য করার । পিসিমা  শ্বশুর বাড়ী থেকে  আসা দিদিদের    কাছে বসাত যত্ন করে খাওয়াতে । অবশ্য তাতে  কোন হের ফের হতনা । সামান্য  হয়তো খেল ।   
          মেজ্‌জ্যাঠাবাবু  মরফিন ইঞ্জেকশন নিত । কবে থেকে  এই নেশা  ধরেছিল  জানিনা । হয়তো প্রথম দিকে একটু আড়াল ছিল , পরের দিকে বিকেলের দিকে   ডিস্পেন্সারিতে  এসে  খোলা খুলিই নিত ইঞ্জেকশন  ইউক্যলিপটাস  অয়েলের গন্ধ পেলেই  বাড়ীর ভেতর  সবাই  চোখাচোখি  করতো ।
                 কতো সময় দেখেছি  বৃষ্টির  মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে । খুব কান্না পেত আমার , মনে আছে । বড্ড মায়া হতো ।   কবে চলে গেছে  আমাদের ছেড়ে  বলিষ্ঠ চেহারার  অল্প  বয়সে  লাঠি খেলা  কুস্তিকরা  মেজ্‌জ্যঠাবাবু  আমার মনে  এখনও  তেমন করেই আছে , যেমন ছিল  ছোটবেলায় ।
``````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````

                           

No comments:

Post a Comment