মেজজ্যাঠাবাবু ।।
মেজজ্যাঠাবাবু ডাক্তারি পাস করেছিল , কিন্তু
আমার যখন থেকে মনে পড়ে বাড়ীর
পোষাকেই দেখেছি । ডাক্তারি করতে দেখিনি কখনও ।
এক পিসিমা ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলতেও দেখিনি । বাড়ীর পোষা পাখী , পশুদের সঙ্গে বলত কথা । সারাক্ষন বই
পত্রে মুখ গুঁজে থাকতো আর মাঝে মাঝে
বিকেলের দিকে গান গাইত কখনো বারান্দায় ঘুরে ঘুরে , কখনও বা পিসিমার ঘরে বসে হারমনিয়াম বাজিয়ে ।
একটা গান খুব প্রিয় ছিল “ জাগরণে
যায় বিভাবরী / আঁখি হতে ঘুম নিলো হরি/ /” দরাজ গলা একটু কর্কশ , কিন্তু নির্ভুল সুর , তাল ।
সমে এসেই নিজের
পশ্চাৎ দেশে এক প্রবল থাপ্পড় মারত ।
মনে আছে একবার আমার ডান হাতের আঙুলে একটা কাঁটা
ফুটে জায়গাটা পেকে উঠে খুব কষ্ট
পাচ্ছিলাম , নানা রকম চেষ্টা করে যখন কোন লাভ হলনা ,তখন ঠিক হল জায়গাটা একটু কেটে ভেতর থেকে পূঁজ রক্ত বের করে দেওয়া হবে । তো সেই মত আমাদের দুর্গা দা, যে আমাদের
ডিসপেনসারিতে খুব অল্প বয়সে কম্পাউন্ডার হয়ে ঢুকে বহু বছর
কাজ করে আমাদের বাড়ীর একজন হয়ে গিয়েছিল ,
মুখের কাছটা একটু বেঁকানো ছোট একটা
ছুরি আর তুলো , ওষুধপত্র ইত্যাদি নিয়ে এসে
বসলো ।
কাছে বসেছিল মেজ্জ্যঠাবাবু , কি মনে
করে দুর্গাদার হাত থেকে ছুরিটা চেয়ে নিল । দুর্গাদা একটু দ্বিধা করে ভালো করে
স্পিরিট দিয়ে আমার আঙুল আর
ছুরিটা মুছে মেজ্জ্যাঠাবাবুর হাতে দিল । মেজ্জ্যাঠাবাবু মুহুর্তের
মধ্যে আঙুলের ঠিক জায়গাটা একটু চিরে দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো “কি রে
লাগলো ?” আমি এতো অবাক হয়ে গেলাম যে কিছু
বলতেই পারলামনা । দুর্গাদা বাকি
কাজটুকু করে দিল ।
পিসিমার হাই ব্লাডপ্রেশার ছিল । শুধু
ওষুধে কমতনা সব সময়, তখন কিছু রক্ত বের করে দিতে হতো । এই নিয়ম
আগেকার দিনে ছিল অনেকে হয়তো জানেন । পিসিমা
ঠাকুর ঘরের সামনের বারান্দায় শুত , দুর্গাদা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ , কিডনি বোল , সব কিছু
গুছিয়ে নিয়ে রক্ত বার করতে বসতো ।মেজ্জ্যাঠাবাবু
যেখানেই থাক এসে পিসিমার নাড়ি ধরে
বসতো ।
মেজ্জ্যাঠাবাবুরা পরের দিকে খুব
কাছেই একটা বাড়ী কিনে চলেগেছিল । খুব সুন্দর বাড়ী ,এক সাহেবের থেকে কেনা । তবে মেজ্জ্যাঠাবাবু সারাদিন
এবাড়িতেই থাকতো । কখনও কখনও হয়তো ঐ
বাড়ী গেল ।
কদিন থাকার পর মেজ্জ্যাঠাইমা কাউকে দিয়ে পিসিমাকে খবর পাঠাল দুদিন ধরে কিছু খাচ্ছেনা ,এখানে এসে থাকলে না খাইয়ে যেন
ছাড়া না হয় ।
পিসিমা ভাইকে ডেকে
বলল দুপুরে না খেয়ে যেন না যায় ।
ভাইয়ের সাধ্য ছিলনা আদেশ অমান্য করার । পিসিমা শ্বশুর বাড়ী থেকে আসা দিদিদের
কাছে বসাত যত্ন করে খাওয়াতে । অবশ্য তাতে
কোন হের ফের হতনা । সামান্য হয়তো
খেল ।
মেজ্জ্যাঠাবাবু মরফিন ইঞ্জেকশন নিত । কবে থেকে এই নেশা
ধরেছিল জানিনা । হয়তো প্রথম দিকে
একটু আড়াল ছিল , পরের দিকে বিকেলের দিকে
ডিস্পেন্সারিতে এসে খোলা খুলিই নিত ইঞ্জেকশন । ইউক্যলিপটাস
অয়েলের গন্ধ পেলেই বাড়ীর ভেতর সবাই
চোখাচোখি করতো ।
কতো সময় দেখেছি বৃষ্টির
মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে । খুব কান্না পেত আমার , মনে আছে । বড্ড মায়া
হতো । কবে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে । বলিষ্ঠ চেহারার অল্প
বয়সে লাঠি খেলা কুস্তিকরা
মেজ্জ্যঠাবাবু আমার মনে এখনও
তেমন করেই আছে , যেমন ছিল ছোটবেলায়
।
``````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````````
No comments:
Post a Comment