Saturday, 21 April 2012

  
                                       দুর্গাদা ।।

       দুর্গা দা  আমাদের  নিজেদের কেউ ছিলনা ।  আমাদের  ডিসপেনসারিতে  কম্পাউন্ডার  হয়ে   ঢুকেছিল  শুনেছি  ১৬/ ১৭ বছর  বয়সে । আমার  যখন থেকে  মনে আছে  তখন  বয়স  অনেকটাই বেড়েছে ।  আমাদের  বাড়ীরই  একজন ।
        একতলার  একটা  ঘরে থাকতো ,বিয়ে  হওয়ার পর  অন্য যায়গায় বাড়ী ভাড়া করে চলে গিয়েছিল ।  খাওয়া দাওয়া  আমাদের সঙ্গেই ছিল ।  আমরা  ভাইফোঁটা  দিতাম ।  শ্যামসুন্দর বাবু  ছিলেন  দুর্গাদার  আগে সর্বেসর্বা  আমাদের  ডাক্তারখানার । বয়েসের কারণে উনি  চলে যাওয়ার  পর  দুর্গাদা  সেই পোস্টটা পেয়েছিল ।
                আমদের  দশটার  চায়ের  আসরেও  থাকতো ।  যখন ভাত খেতে বসতো  খুব  আগ্রহ  নিয়ে  আচমন করা দেখতাম । বাড়ীর  ছোটখাটো  পূজো  করেতো তবে মনে হয়না  খুব পারদর্শী  ছিল বলে । ছোটকাকীমা  বলে বলে দিত ।  মুর্শিদাবাদ জেলার কোন গ্রামে  বাড়ী ছিল ।  আমাকে গল্প বলতো ।  বলেছিল “ আমাদের  গ্রামে  নদীর ধারে  পরী আসে  । রাত্তির বেলা  হাত  ধরা ধরি করে নাচে ।  ছোট্ট ছোট্ট পরী ।  এবারে যখন  বাড়ী   যাব ,তোর জন্যে নিয়ে আসবো ।  ” যখন  বাড়ী থেকে  আসতো খালি হাত ।  জিজ্ঞেস করলে   কোন বার বলতো , ভুলে গেছে । কখনও বলত ,এবারে  আসেনি পরী । এই রকম সব ।  তারপর  একদিন বুঝতে পারলাম  পরী সত্যি করে হয়না । গল্পে হয় । আর চাইনি ।
      গলাব্যথা করলে   তুলোর তুলি বানিয়ে  তাতে   থ্রোটপেন্ট  লাগিয়ে এনে  বলতো “হাঁ কর্‌”  তারপর  ওষুধ লাগিয়ে দিত । বিচ্ছিরি  লাগতো স্বাদ ।  পেট ব্যথা করলে  মিক্সচার গিলিয়ে দিত ।  চোখ দিয়ে জল পড়লে  ড্রপ দিয়ে দিত ।  কেউ একটু  খবর দিলেই  হোল ।
                    আমার  উনিশ দিনের ছোট বোন    কেয়া   তখন  রাস্তার উল্টোদিকে নিজেদের বাড়ীতে চলে গেছে ।  একলা একলা বাড়ীর  বাইরে যাওয়ার  অনুমতি ছিলনা  সে যত কাছেই হোকনা কেন ।  অগত্যা চিঠি ।  কতো কথা যে জমত  কখনও  রান্নার  ঠাকুর  এবাড়ীর  বা  ওবাড়ীরকোন কারণে  আসা যাওয়া করলে  তার হাত দিয়ে ,  অথবা দাদাদের  কাউকে পেলে তাদের কারো হাত দিয়ে আর  যদি কাউকে না পাওয়া  যেত  দুর্গাদার   শরনাপন্ন  হতাম , কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে বলতাম ।  ব্যস্ত  থাকলে  বিরক্ত হতো  মাঝে মাঝে ।   বলতো  “ কাল স্কুলে গেছিস আবার কাল যাবি , দেখা হবে । একদিনও কথা না বলে থাকতে পারিস না ?”  বলতো আবার কাউকে দিয়ে পাঠিয়েও দিত ।
    মনে আছে  এক দুর্গা  পুজোর  ষষ্ঠীর  দিন  খুব  ভোরবেলা  আমাদের স্কুলের  হোস্টেলে  কাউকে  ইঞ্জেকশন  দিতে যাচ্ছিল । আমাকে  বলল  “যাবি তো চল্‌”  আমি তো এক দৌড়ে ওপরে গিয়ে  মাকে জিজ্ঞেস করে , নতুন জামা জুতো পরে  একদম  তৈরি  হয়ে  দুর্গাদার  সাইকেলের  রডে বসে পড়লাম ।
   কি ভালো লেগেছিল দিনটা ।  ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা ।  গাছপালার গন্ধ । নতুন জামা , জুতো পরার আনন্দ সব মিলেমিশে  খুব ভালো লেগেছিল । আর একটা কথা মনে হয়েছিল ।  সেদিন স্কুলকে  যেন অন্যভাবে  দেখেছিলাম ।  দুর্গাদা  হোস্টেলে  ঢূকে গেল । পুজোর  ছুটিতে স্কুল বন্ধ  হয়ে গেছে , ক্লাস গুলো সব তালা বন্ধ ।   আমি স্কুলের  মাঠে বারান্দায়  ঘুরে বেড়িয়ে যেন চেনা  স্কুলকে  নতুন করে চিনছিলাম  ,এতো ফাঁকা  আগে দেখিনি কখনও ।
            ডিসপেনসারির একটা জানলা  বাইরের উঠোনের  দিকে ছিল , দুর্গাদা  সেই জানলার ধারে বসে  কাজ করতো ।  আমরা  স্কুলে যাওয়ার  সময়  আমাদের  পেন গুলো এক এক করে বাড়িয়ে  দিতাম দুর্গাদা  সে গুলোতে  কালি  ভরে  দিত
    যখন  খানিকটা  বড়  হয়েছি ।  কোথাও যাবার জন্যে  চলনদার  দরকার । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে  জানতে চাইত  কোথায়  যাচ্ছি , কেন যাচ্ছি , কখন আসবো । বাড়ীর লোক আর কাকে বলে ?
                      দুর্গাদা  বিয়ে করতে গেল দেশে । দাদারা কেউ কেউ  বরযাত্রী গেল ।  বউদিকে  নিয়ে এসে উঠল ভাড়া  নেওয়া বাড়ীতে । আমরা  খুব  আনন্দ করেছিলাম ।  নিজেদের বাড়ীর  বিয়ের মতো ।

No comments:

Post a Comment