দুর্গাদা ।।
দুর্গা দা আমাদের
নিজেদের কেউ ছিলনা । আমাদের ডিসপেনসারিতে
কম্পাউন্ডার হয়ে ঢুকেছিল
শুনেছি ১৬/ ১৭ বছর বয়সে । আমার
যখন থেকে মনে আছে তখন
বয়স অনেকটাই বেড়েছে । আমাদের
বাড়ীরই একজন ।
একতলার
একটা ঘরে থাকতো ,বিয়ে হওয়ার পর
অন্য যায়গায় বাড়ী ভাড়া করে চলে গিয়েছিল ।
খাওয়া দাওয়া আমাদের সঙ্গেই ছিল । আমরা
ভাইফোঁটা দিতাম । শ্যামসুন্দর বাবু ছিলেন
দুর্গাদার আগে সর্বেসর্বা আমাদের
ডাক্তারখানার । বয়েসের কারণে উনি
চলে যাওয়ার পর দুর্গাদা
সেই পোস্টটা পেয়েছিল ।
আমদের দশটার চায়ের
আসরেও থাকতো । যখন ভাত খেতে বসতো খুব
আগ্রহ নিয়ে আচমন করা দেখতাম । বাড়ীর ছোটখাটো
পূজো করেতো তবে মনে হয়না খুব পারদর্শী
ছিল বলে । ছোটকাকীমা বলে বলে দিত
। মুর্শিদাবাদ জেলার কোন গ্রামে বাড়ী ছিল ।
আমাকে গল্প বলতো । বলেছিল “
আমাদের গ্রামে নদীর ধারে
পরী আসে । রাত্তির বেলা হাত
ধরা ধরি করে নাচে । ছোট্ট ছোট্ট
পরী । এবারে যখন বাড়ী
যাব ,তোর জন্যে নিয়ে আসবো । ”
যখন বাড়ী থেকে আসতো খালি হাত । জিজ্ঞেস করলে
কোন বার বলতো , ভুলে গেছে । কখনও বলত ,এবারে আসেনি পরী । এই রকম সব । তারপর
একদিন বুঝতে পারলাম পরী সত্যি করে
হয়না । গল্পে হয় । আর চাইনি ।
গলাব্যথা করলে তুলোর তুলি বানিয়ে তাতে
থ্রোটপেন্ট লাগিয়ে এনে বলতো “হাঁ কর্” তারপর
ওষুধ লাগিয়ে দিত । বিচ্ছিরি লাগতো
স্বাদ । পেট ব্যথা করলে মিক্সচার গিলিয়ে দিত । চোখ দিয়ে জল পড়লে ড্রপ দিয়ে দিত । কেউ একটু
খবর দিলেই হোল ।
আমার উনিশ দিনের ছোট বোন কেয়া
তখন রাস্তার উল্টোদিকে নিজেদের
বাড়ীতে চলে গেছে । একলা একলা বাড়ীর বাইরে যাওয়ার
অনুমতি ছিলনা সে যত কাছেই হোকনা
কেন । অগত্যা চিঠি । কতো কথা যে জমত । কখনও রান্নার ঠাকুর
এবাড়ীর বা ওবাড়ীরকোন কারণে আসা যাওয়া করলে তার হাত দিয়ে , অথবা দাদাদের
কাউকে পেলে তাদের কারো হাত দিয়ে আর
যদি কাউকে না পাওয়া যেত দুর্গাদার
শরনাপন্ন হতাম , কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে
দিতে বলতাম । ব্যস্ত থাকলে
বিরক্ত হতো মাঝে মাঝে । বলতো
“ কাল স্কুলে গেছিস আবার কাল যাবি , দেখা হবে । একদিনও কথা না বলে থাকতে
পারিস না ?” বলতো আবার কাউকে দিয়ে পাঠিয়েও
দিত ।
মনে আছে
এক দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীর
দিন খুব ভোরবেলা
আমাদের স্কুলের হোস্টেলে কাউকে
ইঞ্জেকশন দিতে যাচ্ছিল ।
আমাকে বলল “যাবি তো চল্” আমি তো এক দৌড়ে ওপরে গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে , নতুন জামা জুতো পরে একদম
তৈরি হয়ে দুর্গাদার
সাইকেলের রডে বসে পড়লাম ।
কি ভালো লেগেছিল দিনটা । ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা । গাছপালার গন্ধ । নতুন জামা , জুতো পরার আনন্দ
সব মিলেমিশে খুব ভালো লেগেছিল । আর একটা
কথা মনে হয়েছিল । সেদিন স্কুলকে যেন অন্যভাবে
দেখেছিলাম । দুর্গাদা হোস্টেলে
ঢূকে গেল । পুজোর ছুটিতে স্কুল
বন্ধ হয়ে গেছে , ক্লাস গুলো সব তালা বন্ধ
। আমি স্কুলের মাঠে বারান্দায় ঘুরে বেড়িয়ে যেন চেনা স্কুলকে
নতুন করে চিনছিলাম ,এতো ফাঁকা আগে দেখিনি কখনও ।
ডিসপেনসারির একটা
জানলা বাইরের উঠোনের দিকে ছিল , দুর্গাদা সেই জানলার ধারে বসে কাজ করতো ।
আমরা স্কুলে যাওয়ার সময়
আমাদের পেন গুলো এক এক করে
বাড়িয়ে দিতাম দুর্গাদা সে গুলোতে
কালি ভরে দিত ।
যখন
খানিকটা বড় হয়েছি ।
কোথাও যাবার জন্যে চলনদার দরকার । খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইত
কোথায় যাচ্ছি , কেন যাচ্ছি , কখন
আসবো । বাড়ীর লোক আর কাকে বলে ?
দুর্গাদা বিয়ে করতে গেল দেশে । দাদারা কেউ কেউ বরযাত্রী গেল । বউদিকে
নিয়ে এসে উঠল ভাড়া নেওয়া বাড়ীতে ।
আমরা খুব
আনন্দ করেছিলাম । নিজেদের বাড়ীর বিয়ের মতো ।
No comments:
Post a Comment