Saturday, 21 April 2012

নকাকা //

আসলে  ন’জ্যাঠাবাবু  বলে   ডাকা  উচিত ছিল  ।আমার বাবার ওপরের  ভাই । ছজন ভাইয়ের মধ্যে   চতুর্থ । কিন্তু যেহেতু  আমরা চার  ভাইবোন আর খুড়তুতো  দিদি  রাঙাদি ছাড়া  জ্যাঠাবাবু  বলার কেউ নেই আর কাকা বলার  জন্যে  তেইশ জন ,   তাই আমরা  চার ভাইবোনও  কাকা বলার দলে ঢুকে পড়ে ছিলাম ।

    ন’কার  ঘর ছিল  তিনতলায়  আমাদের ঘরের  ঠিক ওপরেকিন্তু ঘর  খালি  পড়ে থাকতো ।  দুটি  সন্তানকেই  এবাড়ী তে  থাকতে  হারিয়ে  ন’কা আর ন’কাকীমা এখানে আর  থাকতে পারেনি ।  রাস্তার উল্টোদিকে  সেজজ্যাঠাবাবুর  বাড়ীতে  থাকতে চলে  গিয়েছিল ।

        ন’কা    ওকালতি করতো । আমাদের বাড়ীতে রাস্তার দিকে  মুখ  করা একটা ঘরে  ছিল চেম্বার ।   সন্ধ্যে  বেলা মক্কেলদের  খুব   ভীড়  হতো ।  তার মধ্যে  প্রায়  রোজই আসতেন  ন’কাকার  প্রফেসর  বন্ধু  গোলোক বাবু ।  মাথা ভর্তি পাকাচুল  ।পায়জামা পাঞ্জাবী পরা ।  চেম্বারের  লোকজন একটু  কম থাকলে  ন’কাকা আমাকে   ভেতর থেকে ডেকে পাঠাতো ।  আমি এসেই  বলতাম “গোলোকবাবুচক্‌ ।” তিনটে শব্দ জুড়েই  বলতাম   গোলোক  বাবু পাঞ্জাবীর  পকেট  থেকে  চক্‌  বের করে দিতেন ।

     আমার ওপর  বাড়ীর আরও অনেকের মতই ন’কাকার  একটু বেশী স্নেহ ছিল ।  আমার উনিশ দিনের  ছোট  জ্যাঠতুত  বোন কেয়ার ওপরেও ।আমাদের দুজনের যেন বন্ধু ছিল  ন’কাকা ।  নানা রকম  ঠাট্টা করতো , রাগানোর  চেষ্টা করতো । কানে বেশ কম শুনত ,সেই জন্যে  খুব জোরে জোরে  কথা বলতো । হা হা করে হাসত । শুনতে পাচ্ছি যেন  ন’কাকার হাসি ।   সুন্দর দেখতে ছিল , মাথায়  অনেক চুল ।

     আমাদের  সকাল  দশটার  চায়ের আসরে  ঠিক আসতো ।  আগেই বলেছি  এটা ছিল  আমাদের  পারিবারিক  আড্ডার সময় ।  সম্পর্ক , বয়স  নির্বিশেষে  আড্ডা হতো ।
                 পরে  ন’কাকা  কোর্টএর কাছে ( আমরা অবশ্য বলতাম  কাছারি) , বাড়ী করে চলে গিয়েছিল । আমাদের  বাড়ী  থেকে  অনেকটাই দূর ।  খুব ফাঁকা  লাগতো মনে আছে বাড়ীর নাম রেখেছিল  সূর্যমুখী ।  পুবমুখো  বাড়ী ।

        অনেকখানি  ফাঁকা  জমি  ছিল বাড়ীর   সঙ্গে  , পরে ন’কাকা  ওখানে  খুব সুন্দর  বাগান করেছিল ।  খুব বড় বড়  বেলফুল  ফুটত মনে আছে । আর   মনে আছে  কানাই বাঁশি  কলার কথা ।  বেঁটে বেঁটে  গাছে  এতো লম্বা  কলার কাঁদি  যে প্রায়  মাটিতে  ঠেকে  যেত ।  বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখতে হতো  গাছ ।

কখনও  কখনও ন’কাকা আমাকে  কয়েকদিনের  জন্যে নিয়ে যেত  বাড়ীতে ।  ঠিক উল্টো  দিকে  তিন  বোনের  তিনটি  বাড়ী  ছিল  পর পর ।বাড়ী গুলোর  নাম -  দয়া , মায়া , ক্ষমা । ন ’কাকার  বাড়ীর  পাশে  খানিকটা  পোড়  জমির  পর ছিল  একটা দুতলা  বাড়ী  ইন্দিরাদি , অপর্ণাদিদের বাড়ী ওটা ।  চারজন মেয়ে  আর তাদের বৌদি ,মা, বাবাদাদা  মনে হয় বাইরে কোথাও চাকরী করতেন । মাঝে মাঝে আসতে দেখেছি । দিদিরা  সকলেই আমার  থেকে  বড় কিন্তু  বেশ বন্ধুত্ব  ছিল সকলের  সঙ্গে ।  ন’কাকাকে দাদা আর   ন’ কাকীমা কে বৌদি বলে ডাকতো  ওরা । বাড়ীর  লোকের মতো ছিল ।
  সন্ধ্যেবেলা  ন’কাকার বাড়ীতে  একটা গল্পের আসর বসতো । ন’কাকিমার বোন  ছিল  ফাচু মাসী । কলকাতায়  থাকতো । হাইকোর্টে  প্র্যাক্টিস করতো ।  অসাধারন  গল্প  বলার  ক্ষমতা ছিল। ফাচুমাসী থাকলে তো সোনায়  সোহাগা !
                 একদিন দুপুরে ইন্দিরাদির  সঙ্গে  একটু দুরের একটা  জঙ্গল মতো  জায়গা পার হয়ে  একটা  পকুরের  ধারে পৌঁছেছিলাম , পুকুরে পানিফল  হয়ে আছে  দেখে  দুজনে মিলে  অনেক চেষ্টা   করেছিলাম  ঝাঁকটাকে  টেনে আনার , কিন্তু পারিনি ।

         মাঝে মাঝে ছোটকাকীমা  কিংবা  মার  সঙ্গে  বিকেলের  দিকে  রিক্সা করে  ন’কাকার বাড়ী যেতাম ।  যে রাস্তা  দিয়ে  যেতাম  তার কথা এখনও  ভুলিনি ।    ফাঁকা রাস্তা । আমাদের  ওদিকে  যেমন  হয়  চড়াই  উৎরাই   পার  হয়ে  যাওয়া । চারিদিকে   ঝোপঝাড়  , গাছপালা আর  তার একটা  বুনো  গন্ধ ।   সরকারি  হাসপাতালের  উঁচু  দেওয়াল ।  চারিদিক নির্জন ।  দূরে দূরে  একটা দুটো বাড়ী । পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা । ভেতরে  বাগান ।  ওদিকে  সবই বাঙালীদের  বাড়ী ।  কোনটায়  লোক আছে  কোনটায়  নেই ।  ছোট ছোট সুন্দর নাম ।         

                        কাছারি পার হয়ে  যেতে হত  কখনও  কখনও  কাছারির  সামনের  মাঠ থেকে  ন’কাকা আমাদের  দেখতে পেত ।     আসতে  দেরি থাকলে ছোটবেলা  থেকে  বাড়ীতে থাকা মোহন , যাকে সবাই ডাকতো মোহ্‌না   বলে  তার হাতে   অনেক খাবার দাবার   পাঠিয়ে দিত ।আর তা নাহলে নিজেই নিয়ে আসতো । 

                              যেদিন ন’কাকা বাড়ী থাকতো  দূর থেকে  গলা  শোনা যেত । ন’কাকীমাও ন’কাকার  সঙ্গে থেকে জোরে  কথা বলার  অভ্যেস  হয়ে গিয়েছিল ।

                     কি স্পষ্ট হয়ে এলো ন’কাকার স্মৃতি ।  মাথায় অনেক চুল ।   হাসি হাসি মুখ ।  জোরে   কথা বলা , ঠাকুমার  সব চাইতে  ডানপিটে  ছেলে  আমাদের ন’কাকা ।।

No comments:

Post a Comment