আসলে ন’জ্যাঠাবাবু
বলে ডাকা উচিত ছিল
।আমার বাবার ওপরের ভাই । ছজন
ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ । কিন্তু যেহেতু আমরা চার
ভাইবোন আর খুড়তুতো দিদি রাঙাদি ছাড়া
জ্যাঠাবাবু বলার কেউ নেই ।আর কাকা বলার জন্যে তেইশ জন , তাই আমরা
চার ভাইবোনও কাকা বলার দলে ঢুকে
পড়ে ছিলাম ।
ন’কার
ঘর ছিল তিনতলায় আমাদের ঘরের
ঠিক ওপরে । কিন্তু ঘর
খালি পড়ে থাকতো । দুটি
সন্তানকেই এবাড়ী তে থাকতে
হারিয়ে ন’কা আর ন’কাকীমা এখানে
আর থাকতে পারেনি । রাস্তার উল্টোদিকে সেজজ্যাঠাবাবুর বাড়ীতে
থাকতে চলে গিয়েছিল ।
ন’কা ওকালতি
করতো । আমাদের বাড়ীতে রাস্তার দিকে
মুখ করা একটা ঘরে ছিল চেম্বার ।
সন্ধ্যে বেলা মক্কেলদের খুব
ভীড় হতো । তার মধ্যে
প্রায় রোজই আসতেন ন’কাকার
প্রফেসর বন্ধু গোলোক বাবু । মাথা ভর্তি পাকাচুল ।পায়জামা পাঞ্জাবী পরা । চেম্বারের
লোকজন একটু কম থাকলে ন’কাকা আমাকে
ভেতর থেকে ডেকে পাঠাতো । আমি
এসেই বলতাম “গোলোকবাবুচক্ ।” তিনটে শব্দ
জুড়েই বলতাম । গোলোক
বাবু পাঞ্জাবীর পকেট থেকে
চক্ বের করে দিতেন ।
আমার
ওপর বাড়ীর আরও অনেকের মতই ন’কাকার একটু বেশী স্নেহ ছিল । আমার উনিশ দিনের ছোট
জ্যাঠতুত বোন কেয়ার ওপরেও ।আমাদের
দুজনের যেন বন্ধু ছিল ন’কাকা । নানা রকম
ঠাট্টা করতো , রাগানোর চেষ্টা করতো
। কানে বেশ কম শুনত ,সেই জন্যে খুব জোরে
জোরে কথা বলতো । হা হা করে হাসত । শুনতে
পাচ্ছি যেন ন’কাকার হাসি । সুন্দর
দেখতে ছিল , মাথায় অনেক চুল ।
আমাদের
সকাল দশটার চায়ের আসরে
ঠিক আসতো । আগেই বলেছি এটা ছিল
আমাদের পারিবারিক আড্ডার সময় ।
সম্পর্ক , বয়স নির্বিশেষে আড্ডা হতো ।
পরে ন’কাকা
কোর্টএর কাছে ( আমরা অবশ্য বলতাম
কাছারি) , বাড়ী করে চলে গিয়েছিল । আমাদের
বাড়ী থেকে অনেকটাই দূর ।
খুব ফাঁকা লাগতো মনে আছে । বাড়ীর নাম রেখেছিল সূর্যমুখী । পুবমুখো
বাড়ী ।
অনেকখানি ফাঁকা
জমি ছিল বাড়ীর সঙ্গে , পরে ন’কাকা
ওখানে খুব সুন্দর বাগান করেছিল । খুব বড় বড়
বেলফুল ফুটত মনে আছে । আর মনে আছে
কানাই বাঁশি কলার কথা । বেঁটে বেঁটে
গাছে এতো লম্বা কলার কাঁদি
যে প্রায় মাটিতে ঠেকে
যেত । বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখতে
হতো গাছ ।
কখনও কখনও ন’কাকা আমাকে কয়েকদিনের
জন্যে নিয়ে যেত বাড়ীতে । ঠিক উল্টো
দিকে তিন বোনের
তিনটি বাড়ী ছিল পর
পর ।বাড়ী গুলোর নাম - দয়া , মায়া , ক্ষমা । ন ’কাকার বাড়ীর
পাশে খানিকটা পোড়
জমির পর ছিল একটা দুতলা
বাড়ী । ইন্দিরাদি ,
অপর্ণাদিদের বাড়ী ওটা । চারজন মেয়ে আর তাদের বৌদি ,মা, বাবা।দাদা মনে হয় বাইরে কোথাও চাকরী করতেন । মাঝে মাঝে
আসতে দেখেছি । দিদিরা সকলেই আমার থেকে
বড় কিন্তু বেশ বন্ধুত্ব ছিল সকলের
সঙ্গে । ন’কাকাকে দাদা আর ন’ কাকীমা কে বৌদি বলে ডাকতো ওরা । বাড়ীর
লোকের মতো ছিল ।
সন্ধ্যেবেলা
ন’কাকার বাড়ীতে একটা গল্পের আসর
বসতো । ন’কাকিমার বোন ছিল ফাচু মাসী । কলকাতায় থাকতো । হাইকোর্টে প্র্যাক্টিস করতো । অসাধারন
গল্প বলার ক্ষমতা ছিল। ফাচুমাসী থাকলে তো সোনায় সোহাগা !
একদিন দুপুরে ইন্দিরাদির সঙ্গে
একটু দুরের একটা জঙ্গল মতো জায়গা পার হয়ে
একটা পকুরের ধারে পৌঁছেছিলাম , পুকুরে পানিফল হয়ে আছে
দেখে দুজনে মিলে অনেক চেষ্টা
করেছিলাম ঝাঁকটাকে টেনে আনার , কিন্তু পারিনি ।
মাঝে মাঝে ছোটকাকীমা কিংবা
মার সঙ্গে বিকেলের
দিকে রিক্সা করে ন’কাকার বাড়ী যেতাম । যে রাস্তা
দিয়ে যেতাম তার কথা এখনও
ভুলিনি । ফাঁকা
রাস্তা । আমাদের ওদিকে যেমন
হয় চড়াই উৎরাই
পার হয়ে যাওয়া । চারিদিকে ঝোপঝাড়
, গাছপালা আর তার একটা বুনো
গন্ধ । সরকারি হাসপাতালের
উঁচু দেওয়াল । চারিদিক নির্জন । দূরে দূরে
একটা দুটো বাড়ী । পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । ভেতরে
বাগান । ওদিকে সবই বাঙালীদের
বাড়ী । কোনটায় লোক আছে
কোনটায় নেই । ছোট ছোট সুন্দর নাম ।
কাছারি পার হয়ে যেতে হত । কখনও কখনও কাছারির
সামনের মাঠ থেকে ন’কাকা আমাদের
দেখতে পেত । আসতে দেরি থাকলে ছোটবেলা থেকে
বাড়ীতে থাকা মোহন , যাকে সবাই ডাকতো মোহ্না বলে
তার হাতে অনেক খাবার দাবার পাঠিয়ে দিত ।আর তা নাহলে নিজেই নিয়ে আসতো ।
যেদিন ন’কাকা বাড়ী থাকতো দূর থেকে
গলা শোনা যেত । ন’কাকীমাও
ন’কাকার সঙ্গে থেকে জোরে কথা বলার
অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল ।
কি স্পষ্ট হয়ে
এলো ন’কাকার স্মৃতি । মাথায় অনেক চুল । হাসি হাসি মুখ । জোরে
কথা বলা , ঠাকুমার সব চাইতে ডানপিটে
ছেলে আমাদের ন’কাকা ।।
No comments:
Post a Comment